খেলা শেষ হতে বাকি আর মাত্র চার মিনিট। ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে বিশ্বকাপের শেষ ১৬-র টিকিট প্রায় নিশ্চিত করে ফেলেছিল সেনেগাল। কিন্তু ফুটবল বিধাতা যেন মাঠের বুকে লিখে রেখেছিলেন অন্য কোনো মহানাটক। মাত্র কয়েক মিনিটের ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল আফ্রিকান পরাশক্তিদের স্বপ্ন। শেষ মুহূর্তের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন আর ১২৫ মিনিটের এক চরম বিতর্কিত পেনাল্টিতে সেনেগালকে হারিয়ে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা করে নিল বেলজিয়াম। ফুটবল বিশ্ব সাক্ষী হলো ইতিহাসের অন্যতম সেরা এবং নাটকীয় এক ম্যাচ শেষের।
ম্যাচের শুরু থেকেই ২০১৮ সালের সেমিফাইনালিস্ট বেলজিয়ামের ওপর স্পষ্ট আধিপত্য বিস্তার করে খেলছিল সেনেগাল। হাবিব দিয়ারা ও ইসমাইলা সারের দুর্দান্ত দুটি গোলে জয়ের সুবাস পাচ্ছিল কোচ পেপ থিয়াওয়ের শিষ্যরা। সাবেক আইরিশ অধিনায়ক রয় কিন যেমনটা বলছিলেন, সেনেগাল ম্যাচজুড়ে প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দিয়েও শেষ পর্যন্ত যেন ‘হারার পথ খুঁজে নিল’। ম্যাচের ৮৬ মিনিটে থমাস মুনিয়েরের ক্রস থেকে রোমেলু লুকাকুর গোল প্রথম লাইফলাইন দেয় বেলজিয়ামকে। এর ঠিক তিন মিনিট পর লিয়ান্দ্রো ট্রোসার্ডের চমৎকার সেন্টার থেকে হেডের মাধ্যমে সমতা ফেরান অধিনায়ক ইউরি তিলেমান্স। অথচ এই গোলের কিছুক্ষণ আগেই মাঠে নিজেদের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েছিলেন তিলেমান্স ও ট্রোসার্ড, যা মেটাতে খোদ লুকাকুকে মধ্যস্থতা করতে হয়েছিল।
নির্ধারিত সময়ের খেলা ২-২ সমতায় শেষ হলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানে ১২৫ মিনিটে (১২৪ মিনিট ৪৪ সেকেন্ড) ঘটে ম্যাচের সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনাটি। বেলজিয়াম অধিনায়ক তিলেমান্সকে বক্সের ভেতর সেনেগালের ল্যামিন কামারা চ্যালেঞ্জ করলে পেনাল্টির আবেদন ওঠে। রেফারি দীর্ঘক্ষণ ভিএআর স্ক্রিনে ভিডিও পরীক্ষা করে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন। স্পট কিক থেকে নিজের দ্বিতীয় গোল করে বেলজিয়ামের জয় নিশ্চিত করেন তিলেমান্স নিজে। এটিই এখন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে দেরিতে হওয়া গোলের রেকর্ড। তবে এই পেনাল্টির সিদ্ধান্ত নিয়ে ফুটবল মহলে চলছে তুমুল সমালোচনা। সাবেক ইংলিশ ডিফেন্ডার গ্যারি নেভিল ও রয় কিন সরাসরিই বলেছেন, এটি কোনোভাবেই পেনাল্টি ছিল না এবং রেফারির দীর্ঘক্ষণ দ্বিধাদ্বন্দ্বই প্রমাণ করে সিদ্ধান্তটি কতটা বিতর্কিত ছিল।
এই হার সেনেগালের জন্য পুরনো ক্ষতকে আরও একবার জাগিয়ে তুলল। চলতি বছরের শুরুতে আফকন ফাইনালেও ঠিক একইভাবে ভিএআর-এর মাধ্যমে দেওয়া এক শেষ মুহূর্তের পেনাল্টিতে মরক্কোর কাছে শিরোপা হারিয়েছিল তারা। ম্যাচ শেষে হতাশ সেনেগাল কোচ পেপ থিয়াও বলেন, বিদায় নেওয়াটা ভীষণ কষ্টের, তবে দুই গোলের লিড ধরে রাখতে না পারার ব্যর্থতা তাদের মেনে নিতেই হবে।
অন্যদিকে, এই অবিশ্বাস্য জয় বেলজিয়ামের বুড়ো হাড়ের ভেলকি আরও একবার প্রমাণ করল। ২০১৮ বিশ্বকাপে জাপানের বিপক্ষে দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও যেভাবে তারা ম্যাচ জিতেছিল, আট বছর পর যেন সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি ঘটল। থিবো কোর্তোয়া, কেভিন ডি ব্রুইনা, রোমেলু লুকাকুদের নিয়ে গড়া বেলজিয়ামের এই ‘স্বর্ণালী প্রজন্ম’ হয়তো আগের মতো ছন্দে নেই, কিন্তু শেষ মুহূর্তে ম্যাচ বের করে আনার মানসিকতা যে তাদের ফুরিয়ে যায়নি, তা তারা প্রমাণ করেছে। আগামী ম্যাচে কো-হোস্ট যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি হওয়ার আগে এই অবিশ্বাস্য জয় বেলজিয়াম শিবিরকে দেবে এক বাড়তি আত্মবিশ্বাস।





