দক্ষিণ কোরিয়ায় জন্মহার হ্রাস এখন জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় সরকার নানা আর্থিক প্রণোদনা, ছুটি ও আবাসন সুবিধা চালু করলেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি। এবার ভিন্ন এক উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির বৌদ্ধ সম্প্রদায়। তরুণ-তরুণীদের মধ্যে পরিচয়, প্রেম ও বিয়ে উৎসাহিত করতে শতাব্দীপ্রাচীন একটি বৌদ্ধ মন্দিরে আয়োজন করা হচ্ছে বিশেষ ‘ডেটিং রিট্রিট’।
দেশটির পালগংসান পাহাড়ের কোলে অবস্থিত প্রায় এক হাজার ২০০ বছরের পুরোনো ডংহওয়াসা মন্দিরে আয়োজিত এই ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তরুণ-তরুণীরা শুধু জীবনসঙ্গীই নয়, নতুন বন্ধু ও আত্মবিশ্বাসও খুঁজে পাচ্ছেন।
দেশ বাঁচাতে সঙ্গী খুঁজুন
অনুষ্ঠানের শুরুতেই গেরুয়া বস্ত্র পরিহিত এক বৌদ্ধ ভিক্ষু অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে বলেন, তারা শুধু নিজের জন্য নয়, দেশের ভবিষ্যতের জন্যও এখানে এসেছেন।
তার ভাষায়, “আপনাদের লক্ষ্য শুধু একজন জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়া নয়, ভবিষ্যতে পরিবার গঠন করে দেশের জন্মহার বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখা।”
ডংহওয়াসা মন্দিরের আয়োজক ইউ চোল-জু বলেন, অতীতে বিদেশি আগ্রাসনের সময় যেমন বৌদ্ধ ভিক্ষুরা দেশের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তেমনি এখন জন্মহার কমে যাওয়াও একটি জাতীয় সংকট। তাই এ সমস্যার সমাধানে তারাও ভূমিকা রাখতে চান।
ভয়াবহভাবে কমছে জন্মহার
বিশ্বের সবচেয়ে কম জন্মহারের দেশগুলোর একটি দক্ষিণ কোরিয়া।
২০২৩ সালে দেশটিতে একজন নারীর গড় সন্তান জন্মদানের হার নেমে আসে ০.৭২-এ, যা জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় ২.১ হারের অনেক নিচে।
বিশ্লেষকদের মতে, আবাসন ব্যয় বৃদ্ধি, সন্তান পালনের উচ্চ খরচ, নারীদের কর্মজীবনে অগ্রাধিকার এবং বিয়ে নিয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন- সব মিলিয়েই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণদের মধ্যে প্রেম ও সামাজিক মেলামেশার প্রবণতাও আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
কঠিন প্রতিযোগিতা পেরিয়ে সুযোগ
ডেটিং রিট্রিটে অংশ নেওয়া সহজ নয়। আবেদনকারীদের প্রশ্নপত্র, ভিডিও সাক্ষাৎকার এবং বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার বিষয়ে তাদের আন্তরিকতা যাচাই করা হয়।
এবারের আয়োজনে অংশ নিতে এক হাজার ৫৮০ জনের বেশি আবেদনকারীকে পেছনে ফেলে নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র কয়েক ডজন তরুণ-তরুণী।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
ব্যস্ত জীবনে সঙ্গী খুঁজে পাওয়া কঠিন
২৮ বছর বয়সী কিম আহ-কিয়ং, যার বৌদ্ধ নাম ‘সুনহিয়েজি’, বলেন, চাকরির কারণে রাজধানী সিউল ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে যাওয়ার পর তার নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, “অফিস আর বাসা- এই দুই জায়গার মধ্যেই জীবন সীমাবদ্ধ। নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগই নেই।”
৩০ বছর বয়সী কোয়ন সেউং-ওহ, যিনি এনিও নামে পরিচিত, জানান, বন্ধুদের উদ্যোগে প্রায় ১০টি ‘ব্লাইন্ড ডেট’-এ অংশ নিলেও কোনও সম্পর্ক স্থায়ী হয়নি।
তার কর্মস্থলে প্রায় ৯৭ শতাংশ সহকর্মীই পুরুষ। ফলে স্বাভাবিকভাবেই নতুন নারীসঙ্গী খুঁজে পাওয়া তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
দিনভর পরিচয়, আড্ডা আর নানা আয়োজন
৩০ ঘণ্টার এই রিট্রিটে অংশগ্রহণকারীদের জন্য ছিল পরিচয়পর্ব, জুটি বেঁধে হাঁটা, মধ্যাহ্নভোজ, দ্রুতগতির ‘স্পিড ডেটিং’, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং দলীয় নানা কার্যক্রম।
প্রথম পরিচয়পর্বেই এনিও নিজের হাতে তৈরি ফরাসি পেস্ট্রি সবার মধ্যে বিতরণ করে উপস্থিতদের প্রশংসা কুড়িয়ে নেন।
অন্যদিকে সুনহিয়েজির প্রথম সঙ্গী হন ৩২ বছর বয়সী সরকারি কর্মকর্তা মিনহো। পরে মধ্যাহ্নভোজের জন্য মিনহো বেছে নেন ২৮ বছর বয়সী ডিজাইনার রুবিকে।
দিনজুড়ে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের পেশা, শখ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন।
সবচেয়ে বিব্রতকর পর্ব
দিনের সবচেয়ে অস্বস্তিকর কিন্তু সবচেয়ে প্রাণবন্ত আয়োজন ছিল ট্যালেন্ট শো।
কেউ জনপ্রিয় কে-পপ গানের সঙ্গে নাচেন, কেউ গান গেয়ে শোনান, কেউ আবার স্প্যানিশ ভাষায় নিজের পরিচয় দেন।
এক নারী অংশগ্রহণকারী বাঁশিতে কে-পপের জনপ্রিয় একটি সুর পরিবেশন করে সবার মন জয় করেন।
সরকারও করছে উৎসাহ
দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার দীর্ঘদিন ধরেই বিয়ে ও সন্তান জন্মে উৎসাহ দিতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে।
দীর্ঘ মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি, নবজাতকের জন্য নগদ অর্থ সহায়তা, নবদম্পতিদের জন্য ভর্তুকিযুক্ত আবাসনসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে ২০০৬ সাল থেকে প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে সরকার।
এছাড়া স্থানীয় সরকার ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন নিয়মিত ‘ম্যাচমেকিং’ আয়োজন করছে। কোথাও কাঠের কাজ শেখানোর কর্মশালা, কোথাও নদীর তীরে সঙ্গীতানুষ্ঠান-সবকিছুর লক্ষ্য একটাই, তরুণদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলা।
ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত
দীর্ঘ সময় জন্মহার কমতে থাকলেও ২০২৪ সাল থেকে কিছুটা উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
এ বছর দক্ষিণ কোরিয়ায় একজন নারীর গড় সন্তান জন্মদানের হার ১.০-এ পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা ২০২৫ সালের ০.৮ হার থেকে কিছুটা বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু সরকারি উদ্যোগের ফল কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও সামাজিক মনোভাবের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে।
সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে অবিবাহিতদের মধ্যে বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে।
শেষ পর্যন্ত কী হলো?
রিট্রিট শেষে মোট আটটি নতুন জুটি গড়ে ওঠে। এর মধ্যে দুটি সম্পর্ক তৈরি হয় অনুষ্ঠানের কর্মী ও অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে।
যারা সঙ্গী খুঁজে পাননি, তারাও হতাশ হয়ে ফেরেননি।
এনিও জানান, সুযোগ পেলে তিনি আবারও এই আয়োজনে অংশ নেবেন।
অন্যদিকে সুনহিয়েজি বলেন, তিনি জীবনসঙ্গী না পেলেও অনেক নতুন বন্ধু পেয়েছেন। রাত তিনটা পর্যন্ত সহঅংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে গল্প করেছেন এবং ইতোমধ্যে একসঙ্গে ব্রাঞ্চ করার পরিকল্পনাও করেছেন।
আয়োজকদের মতে, সবাই জীবনসঙ্গী নিয়ে ফেরেন না, কিন্তু প্রায় প্রত্যেকেই নতুন বন্ধুত্ব, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নতুন আশাবাদ নিয়ে মন্দির ছাড়েন। সূত্র: বিবিসি





