মন্ত্রীর ডিওতে কাজ হবে না, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ছাড়া!

গ্যাস অনুসন্ধানে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ফিজিবিলিটি স্টাডি থেকে অব্যাহতি দিতে এবার আধা সরকারিপত্র (ডিও) দিয়েছেন বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এমপি। পরিকল্পনা মন্ত্রীর বরাবরে প্রেরিত ওই ডিও দেওয়ার পরও কোন অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে কোন সিগন্যাল না এলে তাদের পক্ষে বিষয়টি সমাধান করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে। সমাধান চাইলে প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী সরকারিপত্রে লিখেছেন, পরিকল্পনা বিভাগ থেকে জারিকৃত ‘সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকা জুন, ২০২২’-এর ১.১.২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ৫০ কোটি টাকার উর্ধে প্রক্কলিত ব্যয়ের সকল বিনিয়োগ প্রকল্প গ্রহণের পূর্বে তৃতীয় পক্ষের দ্বারা সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

জ্বালানি খাতে তেল/গ্যাস অনুসন্ধানে দ্বি-মাত্রিক ও ত্রি-মাত্রিক সাইসমিক জরিপ, অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কূপ খনন, কূপের ওয়ার্কওভার, কূপ খনন সংক্রান্ত রিগ ক্রয় ও কমিশনিং এবং গ্যাস উৎপাদন ফিল্ডের অন্যান্য উন্নয়ন কর্মকান্ড দেশের অন্যান্য মন্ত্রণালও বিভাগ/কোম্পানির কাজের থেকে ভিন্নধর্মী। সাইসমিক সার্ভে ও কূপ খনন প্রকল্পসমুহ একই প্রকৃতির হওয়ায় সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রদত্ত বিসিআর, আইআইআর ও ইআইএ সকলক্ষেত্রে প্রায় একই রকম হয়।

পরিপত্র শিথিল করা হলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং উৎপাদন প্রক্রিয়াকরণ দ্রুততার সঙ্গে সম্পাদন করা সম্ভব বলে উল্লেখ করেছেন মন্ত্রী।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের বর্তমান সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামও অনেক চেষ্টা করেছিলেন ফিজিবিলিটি স্টাডি থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য। পরিকল্পনা বিভাগের সচিব বরাবরে একটি পত্র দিয়েছিলেন অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে। ওই চিঠিতে তিনি লেখেন, দ্রততম সময়ে ও অর্থসাশ্রয় করে বাপেক্সের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে কমিটি গঠনপূর্বক অতিরিক্ত অর্থব্যয় ব্যতিরেকে ফিজিবিলিটি স্টাডি করা সম্ভব। গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্নের ক্ষেত্রে অনেকগুলো ধাপ অনুসরণ করতে হয়। এ সকল কার্যক্রম অনুসরণ করে চূড়ান্ত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন পেতে ৬ থেকে ১২ মাস সময় প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি প্রতিটি প্রকল্পে সমীক্ষা বাবদ ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা প্রয়োজন হয়।

পেট্রোবাংলার একাধিক বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়। আর সেই কোম্পানির (ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি-আইআইএফসি) সঙ্গে জড়িত রয়েছে হোমড়া-চোমড়া সাবেক আমলারা। যখনই বিষয়টি সামনে আসে তখনেই তারা পেছনে থেকে কলকাঠি নাড়তে শুরু করেন। যে কারণে বিষয়টি আর বেশিদূর এগুতে পারে না।

২০২২ সালে পরিপত্র জারির আগেও বাপেক্স নিজেরাই এই কাজ করত। ওই অর্ডারের পর ডিপিএম (সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি) বুয়েট, আইবিএ, আইআইএফসির মাধ্যমে সম্ভাব্যতা যাচাই করতে বলা হয়। তবে এখন পর‌্যন্ত আইআইএফসি ছাড়া অন্য কোন প্রতিষ্ঠানে কাজ দেওয়ার নজীর খুঁজে পাওয়া যায়নি। যে কারণে তারা যে দর দাবি করে সেই দরে তাদের নির্ধারিত সময়ে চুক্তি করা হয়। এতে করে অনেক কাজ যথা সময়ে করা যায়না বলে বাপেক্স দাবি করেছে।

বাপেক্সের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, সিসমিক সার্ভে, মূল্যায়ন কূপ এবং অনুসন্ধান কূপ খননও এক ধরণের প্রাক সমীক্ষা। তার আবার সম্ভাব্যতা যাচাই কি। অতীতে অনেক কূপ ড্রাই হয়েছে ভবিষ্যতেও হতে পারে। তারা কি কখনও দায় নিয়েছে কূপ ড্রাই হওয়ার। আন্তর্জাতিকভাবে ১০ টি কূপ খনন করে ১টিতে গ্যাস পেলে সফল বিবেচনা করা হয়।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান বার্তা২৪.কমকে জানিয়েছেন, গ্যাস কূপ খননের বিষয়টি সবই একই রকম। সব কূপের একই গভীরতা, একই রকম পরিবেশ, একই রকম অন্যান্য পারিপার্শ্বিক অবস্থা। তাহলে কেনো বারবার তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে প্রাকসমীক্ষা করতে হবে। যদি কখনও কোন জনবহুল এলাকায় ‍কূপ খনন করা হয়, সেটি ভিন্ন বিষয় হতে পারে। একই ফিল্ডে প্রত্যেক কূপের জন্য প্রাক-সমীক্ষা জরুরি হতে পারে না, এতে অর্থ ও সময়ের অপচয় হয় শুধু।

অনেক সমলোচনার পর ফিজিবিলিটি স্টাডি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেছিল। কাজটিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন পেট্রোবাংলার তৎকালীন চেয়ারম্যান জনেন্দ্র নাথ সরকার। তার যুক্তি ছিল, কূপ খনন করলে গ্যাস পেতেও পারি, আবার নাও পেতে পারি। গ্যাস পেলে অনেক মুনাফা, আর না পেলে পুরো বিনিয়োগ জিরো, এখানে আবার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের অর্থ কী? এটাতো ব্রিজ-কালভার্ট নয় যে সম্ভাব্যতা যাচাই করবো। আমরা কূপ খননের জায়গা চূড়ান্ত করি তার আগে সিসমিক সার্ভেসহ অনেক কাজ করতে হয়, এটাও তো এক ধরণের ফিজিবিলিটি স্টাডি। তাহলে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কেনো সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে।

ফিজিবিলিটি স্টাডিতে একদিকে যেমন সময়ক্ষেপণ হয়, তেমনি কাড়িকাড়ি টাকা খরচ করতে হয়। দরপত্রের মাধ্যমে কনসালটেন্ট নিয়োগ প্রক্রিয়াও খুবই দীর্ঘ, আবার অনেক ব্যয়বহুল। কনসালটেন্টের মাধ্যমে যে কাজ ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা খরচ হয়, একই কাজ পেট্রোবাংলা নামমাত্র মূল্য ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় সম্পন্ন করতে পারে। কনসালটেন্ট যে কাজ করতে কয়েকমাস সময় নেয়, সেই কাজ ১৫ দিনের মধ্যে শেষ করতে পারে বাপেক্স-পেট্রোবাংলা। কনসালটেন্ট যে কাজ করে, সেটাও পেট্রোবাংলার তথ্যের উপর নির্ভর করে এবং তাদের লোকজনের সহায়তা নিয়ে। মাঝ থেকে একটি গ্রুপ কিছু টাকা নিয়ে চলে যায়।

২০২৪ সালে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় অনুসন্ধান কূপ, ২ডি, ৩ডির ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষের ফিজিবিলিটি স্টাডি থেকে অব্যাহতি দিয়েছিল। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অনুমোদন পেলেই চূড়ান্ত হয়ে যেতো। কিন্তু অন্তবর্তীকালীন সরকার চুড়ান্ত অনুমোদন না দিয়ে বাতিল করে দেয়।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, জ্বালানি খাতের কাজের ধরণের সঙ্গে আর অন্য খাত মেলে না, এই কথাটিই বুঝানো দায়। ডিপিপি জটিলতা কেমন প্রভাব ফেলে তার এই নজীর হতে পারে পাবনার মোবারকপুর। সেখানে কূপ খনন করতে ১০ হাজার পিএসআই (চাপ বর্গ ইঞ্চি) ব্লোআউট কন্ট্রোল প্রিভেন্টার (বিওপি) নিয়ে কাজ শুরু করে। কূপ খননের সময় দেখা গেলো কূপের প্রেসার ১২ হাজার পিএসআই। চাপ আরও বাড়ন্ত ছিল, বাধ্য হয়ে কাজ অসমাপ্ত রেখে আরডিপিপি প্রণয়ন করা হয়। এতে চলে গেছে কয়েক বছর সময়। নানা জটিলতার কারণে তড়িৎ সিদ্ধান্তের প্রয়োজন পড়ে এমন অনেক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ এড়িয়ে চলেন কর্মকর্তারা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তেল-গ্যাস উন্নয়ন। আর তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ঢিলেমির কারণে দেশে জ্বালানির মহাসংকট বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। দিনদিন বাড়ন্ত রয়েছে গ্যাস সংকট।

যখন অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করার জরুরি ছিল, সেই সময়ে অন্তবর্তীকালীন সরকারের আরও একটি পেরেক ঠুকে দিয়ে গেছে। জিডিএফ অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়ন হিসেবে বিবেচিত হতো। ওই প্রকল্প অনুমোদন দিতেন মন্ত্রী অথবা উপদেষ্টা।অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়। এনইসির অনুমোদনের পর শুধু জিও জারি হতেই সময় লেগে যায় ৩ থেকে ৪ মাসের মতো। আর পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনেও কয়েক মাসের ধাক্কা। যদি কোন ব্যাখ্যা চাওয়া হয় তাহলেতো কথাই নেই।