কোরআনের বর্ণনায় পাখির বিচিত্র জগৎ

পাখি সৃষ্টিজগতের এক বিস্ময়। আল্লাহ পৃথিবীতে বিচিত্র সব পাখি সৃষ্টি করেছেন।

মানুষ নানাভাবে পাখির দ্বারা উপকৃত হয়। পাখিও পরিবেশ ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পবিত্র কোরআনে পাখি ও পাখির বিচিত্র জগতের নানা দিক উঠে এসেছে। তা সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হলো—

১. পাখি সমাজ ও শ্রেণিবদ্ধ : মানুষ যেমন নানা জাত ও শ্রেণিতে বিভক্ত, মানুষ যেমন সমাজবদ্ধ হয়ে জীবন যাপন করে, পাখিও তেমন নানা প্রজাতি ও শ্রেণিতে বিভক্ত।

পাখিরা সঙ্গী গ্রহণ, সন্তান জন্ম দান, জীবিকার অনুসন্ধান ও আত্মরক্ষার প্রয়োজনে সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘ভূপৃষ্ঠে বিচরণশীল এমন জীব নেই অথবা নিজ ডানার সাহায্যে এমন কোনো পাখি ওড়ে না, কিন্তু তারা তো তোমাদের মতো এক একটি উম্মত।’

(সুরা : আনআম, আয়াত : ৩৮)

তাফসিরবিদরা আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, তারা তোমাদের মতো উম্মত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো তারা সৃষ্টি, জীবিকা, জীবন-মৃত্যু, সুখ-দুঃখের অংশীদার হিসেবে তোমাদের মতো সমাজ ও শ্রেণিবদ্ধ। উল্লিখিত আয়াতে সীমিত পরিমাণে হলেও পাখির বুদ্ধিমত্তা থাকার ইঙ্গিত মেলে।

২. আছে নিজস্ব ভাষা : আধুনিক যুগের বিজ্ঞানীরা বলেন, পাখির নিজস্ব ভাষা আছে। তারা এর মাধ্যমে নিজেদের ভেতর ভাব বিনিময় করে, পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করে, স্বগোত্রীয়দের সতর্ক করে ইত্যাদি। দেড় হাজার বছর আগে আল-কোরআন শিখিয়েছে পাখিরও নিজস্ব ভাষা আছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘সুলাইমান হয়েছিল দাউদের উত্তরাধিকারী এবং সে বলেছিল, হে মানুষ! আমাকে পাখিদের ভাষা শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। আর আমাকে সবকিছু দেওয়া হয়েছে, এটা অবশ্যই সুস্পষ্ট অনুগ্রহ।

’ (সুরা : নামল, আয়াত : ১৬)

৩. সংবাদবাহক হুদহুদ : আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যম ও প্রযুক্তি আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত পাখি সংবাদ সংগ্রহ ও বহনের কাজ করত। পবিত্র কোরআনে সংবাদ সংগ্রাহক হুদহুদ পাখির বর্ণনা এসেছে। পাখিটি সুলাইমান (আ.)-এর দরবারে রানি বিলকিসের সংবাদ পৌঁছে দিয়েছিল। ইরশাদ হয়েছে, ‘সুলাইমান পাখিদলের সন্ধান করল এবং বলল, ব্যাপার কি, হুদহুদকে দেখছি না যে! সে অনুপস্থিত না কি? সে উপযুক্ত কারণ না দর্শালে আমি অবশ্যই তাকে কঠিন শাস্তি দেব অথবা জবাই করব। অনতিবিলম্বে হুদহুদ এসে পড়ল এবং বলল, আপনি যা অবগত নন আমি তা অবগত হয়েছি এবং সাবা থেকে সুনিশ্চিত সংবাদ নিয়ে এসেছি। আমি তো এক নারীকে দেখলাম তাদের ওপর রাজত্ব করছে। তাকে দেওয়া হয়েছে সবকিছু থেকে এবং তার আছে এক বিরাট সিংহাসন।’ (সুরা : নামল, আয়াত : ২০-২৩)

৪. পাখিরাও আল্লাহর ইবাদত করে : আল্লাহর সব সৃষ্টি আপন বৈশিষ্ট্য অনুসারে নিজস্ব পদ্ধতিতে আল্লাহর ইবাদত করে থাকে। পাখিরাও নিজস্ব ভঙ্গি ও পদ্ধতিতে আল্লাহর ইবাদত ও জিকির করে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তুমি কি দেখ না যে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যারা আছে তারা এবং উড্ডীয়মান বিহঙ্গকুল আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে? প্রত্যেকেই জানে তারা ইবাদতের ও পবিত্রতা ঘোষণার পদ্ধতি এবং তারা যা করে সে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক অবগত।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৪১)

৫. পাখি আল্লাহর বাহিনী : ইয়েমেনের শাসক আবরাহা মক্কা নগরীতে অবস্থিত পবিত্র কাবাঘর ধ্বংস করতে এসেছিল। আল্লাহ সেই সুসজ্জিত ও সুবিশাল বাহিনীকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন তাঁর পাখি বাহিনী দিয়ে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তুমি কি দেখনি তোমার প্রতিপালক হস্তী-অধিপতিদের প্রতি কী করেছিলেন? তিনি কি তাদের কৌশল ব্যর্থ করে দেননি? তাদের বিরুদ্ধে তিনি ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি প্রেরণ করেন। যারা তাদের ওপর প্রস্তর-কংকর নিক্ষেপ করে। অতঃপর তিনি তাদের ভক্ষিত তৃণসদৃশ করেন।’

(সুরা : ফিল, আয়াত : ১-৫)

৬. পাখি নবীর বাহিনীর অংশ : আল্লাহ যেমন তাঁর বাহিনী হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন, তেমন তিনি পাখিতে নবীর বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। আল্লাহ বলেন, ‘সুলাইমানের সামনে সমবেত করা হলো তার বাহিনীকে—জিন, মানুষ ও বিহঙ্গকুলকে এবং তাদেরকে বিন্যস্ত করা হলো বিভিন্ন ব্যুহে।’ (সুরা : নামল, আয়াত : ১৭)

৭. আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন : সৃষ্টিজগৎ মহান আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন। পাখিজগতের বৈচিত্র্য আল্লাহর সৃষ্টি-কুশলতার কথাই মনে করিয়ে দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘তারা কি লক্ষ করে না আকাশের শূন্য গর্বে নিয়ন্ত্রণাধীন পাখির প্রতি? আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ সেগুলোকে স্থির রাখেন না। অবশ্যই এতে নিদর্শন আছে মুমিন সম্প্রদায়ের জন্য।’

(সুরা : নাহল, আয়াত : ৭৯)

৮. জান্নাতিদের খাবার : জান্নাতে পাখির গোশত জান্নাতিদের খাবার হবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘এবং (জান্নাতিদের জন্য থাকবে) তাদের পছন্দমতো ফলমূল আর তাদের কাঙ্ক্ষিত পাখির গোশত।’

(সুরা : ওয়াকিয়া, আয়াত : ২০-২১)

৯. আসমান থেকে প্রেরিত খাবার : আল্লাহ আসমানি খাবার হিসেবে বনি ইসরাঈলকে পাখির গোশত দান করেছিলেন। আল্লাহ বলেন, ‘আমি মেঘ দ্বারা তোমাদের ওপর ছায়া বিস্তার করলাম এবং তোমাদের কাছে মান্না ও সালওয়া (এক প্রকার পাখির গোশত) প্রেরণ করলাম।’

(সুরা : বাকারা, আয়াত : ৫৭)

১০. পাখি নবীর ইবাদতের সঙ্গী : আল্লাহ পাখিকে নবী দাউদ (আ.)-এর ইবাদতের সঙ্গী করেছিলেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি নিশ্চয়ই দাউদের প্রতি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং আদেশ করেছিলাম—হে পর্বতমালা! তোমরা দাউদের সঙ্গে আমার পবিত্র ঘোষণা করো এবং বিহঙ্গকুলকেও।’

(সুরা : সাবা, আয়াত : ১০)

আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক জ্ঞান দান করুন। আমিন।