‘জাতীয় পিতামহ’ হিসেবে পরিচিত রাজাকে বিদায় দিচ্ছে নরওয়ে

নরওয়ের আধুনিক ইতিহাস ও জাতীয় ঐক্যের অন্যতম প্রধান রূপকার, দীর্ঘকাল শাসনভার পরিচালনা করা রাজা পঞ্চম হারাল্ডকে চরম ভাবগাম্ভীর্য ও অশ্রুসজল শ্রদ্ধায় শেষবিদায় জানাচ্ছে পুরো জাতি। বুধবার নরওয়ের রাজধানী ওসলোর ঐতিহাসিক লুথেরান ক্যাথেড্রালে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অনুষ্ঠিত এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানে রাজপরিবারের সদস্য, দেশি-বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান ও শীর্ষ কূটনীতিকদের উপস্থিত রয়েছেন। রাজপ্রাসাদ প্রাঙ্গণে হাজারো সাধারণ মানুষের ফুল, মোমবাতি দিয়ে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করছেন।

দুপুর ঠিক বারোটায় রাজপ্রাসাদ থেকে প্রথাগত গান ক্যারেজে করে রাজকীয় কফিন নিয়ে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার শোভাযাত্রাটি প্রধান সড়ক ধরে ক্যাথেড্রালের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। শোভাযাত্রার অগ্রভাগে পায়ে হেঁটে অংশ নেন নতুন রাজা অষ্টম হাঁকন। নরওয়ের নতুন রানি মেতে-মারিত এবং প্রয়াত রাজার ৮৯ বছর বয়সী স্ত্রী রানি সোনিয়া গাড়িতে করে কফিনের পেছনে যাত্রা করেন।

কফিনটি ক্যাথেড্রালে পৌঁছানোর পর দুপুর একটায় এক মিনিট নীরবতা পালনের মাধ্যমে পুরো দেশ স্তব্ধ হয়ে যায়। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষে ক্যাথেড্রালের ওপর দিয়ে চারটি এফ-থার্টিফাইভ যুদ্ধবিমান ‘মিসিং ম্যান’ ফর্মেশনে উড়ে গিয়ে রাজাকে শেষ স্যালুট জানায়। পরবর্তীতে আকের্সহুস প্রাসাদের মাউসোলিয়ামে গোপন নকশায় তৈরি আড়াই মিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি বিশেষ সারকোফ্যাগাসে তাকে পিতা ও পিতামহের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। দাফন সম্পন্ন হওয়ার পরপরই এতদিন ধরে অর্ধনমিত রাখা দেশের সব পতাকাকে উঁচিয়ে দেওয়া হয় এবং এক ঘণ্টা ধরে ওসলোজুড়ে চার্চের ঘণ্টা বাজিয়ে রাজকীয় শ্রদ্ধা জানানো হয়।

এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় উপস্থিত ছিলেন ব্রিটেনের যুবরাজ উইলিয়াম, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি, স্পেনের রাজদম্পতি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, জর্ডান, জাপান ও মোনাকোর রাজপরিবারের প্রতিনিধিরা এবং ফ্রান্স, জার্মানি, ফিনল্যান্ড ও চেক রিপাবলিকের মতো শীর্ষ পশ্চিমা দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানেরা। ঐতিহাসিক এই বিদায় অনুষ্ঠান নির্বিঘ্ন করতে ওসলোতে পুলিশের প্রায় তিন হাজার সদস্য ও সাড়ে তিন হাজার সেনা সদস্যের সমন্বয়ে নরওয়ের ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়। একই সাথে ওসলো এবং আশেপাশের আকাশসীমায় জারি করা হয় নজিরবিহীন বিধিনিষেধ।

১৯৯১ সালে সিংহাসনে আরোহণ করা রাজা পঞ্চম হারাল্ড মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ছিলেন ইউরোপের সবচেয়ে প্রবীণতম শাসক। জীবনের শেষ দিনগুলোতে নানা শারীরিক অসুস্থতায় ভুগলেও তিনি কখনো সিংহাসন ত্যাগের পথে হাঁটেননি, যার কারণে নরওয়েজীয়দের হৃদয়ে তার অবস্থান ছিল সুদৃঢ়। উগ্রতার বিপরীতে উদারতা, সহনশীলতা ও প্রগতিশীলতার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন তিনি। বিশেষ করে ২০১৬ সালে তার রাজত্বের ২৫ বছর পূর্তিতে দেওয়া কালজয়ী ভাষণটিতে তিনি ভালোবাসার বৈচিত্র্য, বহুসংস্কৃতিবাদ এবং সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধার বাণী প্রকাশ করে গোটা বিশ্বে সমাদৃত হন।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পূর্ববর্তী দিনগুলোতে হাজার হাজার নরওয়েজীয় টানা লাইনে দাঁড়িয়ে প্রিয় রাজাকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ নিয়েছিলেন।