ফারাক্কা বাঁধ ও পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে চলমান বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিবাদ এবং পর্যালোচনার দাবির আবহেই এক বিশেষ পদক্ষেপে পলি ব্যবস্থাপনা নীতি অনুমোদন করেছে বিহার সরকার। মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘বিহার জলসম্পদ পুনরুদ্ধার ও পলল ব্যবস্থাপনা নীতি ২০২৪’ শিরোনামের এই ঐতিহাসিক খসড়া প্রস্তাবটি পাস হয়। মূলত রাজ্যের প্রধান নদী ও জলাশয়গুলোর স্বতস্ফূর্ত প্রবাহ বজায় রাখা, পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরো সুসংগঠিত করার লক্ষ্যেই এই নতুন নীতি নিয়ে আসা হয়েছে।
এই নীতি এমন এক সময়ে পাশ হলো যখন ফারাক্কা ব্যারেজের কারণে গঙ্গার উজানে মাত্রাতিরিক্ত পলি জমে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে; এমন অভিযোগ তুলে বিহারের একাধিক রাজনৈতিক দল ব্যারেজটি ভেঙে ফেলার দাবি তুলছে। একই সাথে চলতি বছরের ডিসেম্বরে মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তিটি পুনঃমূল্যায়নেরও জোর দাবি উঠেছে। বিহার সরকারের এই নতুন সিদ্ধান্তটিকে ফারাক্কা ব্যারেজের কারণে সৃষ্ট পলি জমে যাওয়ার সমস্যা সমাধান এবং নিয়মিত পলি অপসারণ না হওয়ার দীর্ঘদিনের জটিলতা দূর করার একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সিদ্ধান্তের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে মন্ত্রিসভা সচিবালয় বিভাগের অতিরিক্ত মুখ্য সচিব অরবিন্দ কুমার চৌধুরী জানিয়েছেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ও ধরনে বড় ধরনের অনিয়ম দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষির ওপর বাড়তি চাপ, নগরায়ন ও শিল্পায়নের কারণে পানির চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তিনি আরো বলেন, ভারী পলি জমার কারণে নদী, ব্যারেজ ও জলাশয়গুলোর পানি বহন ও ধারণক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ফলে সেচ ক্ষমতা যেমন হ্রাস পাচ্ছে, তেমনি দেখা দিচ্ছে ঘনঘন ও তীব্র বন্যার ঝুঁকি। একই সাথে নদীগুলোর নাব্যতা কমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ এবং ভূ-পৃষ্ঠের পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে মানবজীবন রক্ষা ও সার্বিক উন্নয়ন বজায় রাখতে পানি নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার কারণেই সরকার এই পলিসি গ্রহণ করেছে।
অরবিন্দ কুমার চৌধুরী জানান, এই নীতির প্রধান উদ্দেশ্য হলো জলাশয়গুলো থেকে জমে থাকা পলি অপসারণ করে সেগুলোর স্বাভাবিক ধারণক্ষমতা ফিরিয়ে আনা। উত্তোলন করা এই পলি অপচয় না করে বিভিন্ন পরিকাঠামো নির্মাণ কাজে ব্যবহার করা হবে। বিশেষ করে জাতীয় সড়ক, রেলপথ, রাজ্য সরকারের আওতাধীন সড়ক, সেচ অবকাঠামো, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং ভবন নির্মাণের মতো প্রকল্পগুলোতে মাটির বিকল্প হিসেবে এই পলি ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিহারের পানিসম্পদ বিভাগের মন্ত্রিসভা নোটে বলা হয়েছে, বর্তমানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয়ভাবে মাটির ব্যবস্থা করতে গিয়ে নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয় এবং অনেক সময় উর্বর কৃষি জমির মাটি ব্যবহার করা হয়। নতুন নীতির ফলে নদী থেকে তোলা পলি দিয়ে সেই চাহিদা পূরণ হবে, যা উর্বর জমি রক্ষায়ও ভূমিকা রাখবে।
জলবায়ু ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু সাবধানতা অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন। সোসাইটি ফর ওয়াটারশেড অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্টের পরিচালক ও প্রগতিশীল কৃষি মঞ্চের জাতীয় আহ্বায়ক কিশোর জয়সওয়াল জানান, নদী ও জলাশয় থেকে পলি তুলতে হবে অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক ও নির্ধারিত পরিমাপ মেনে। কারণ সঠিক নিয়ম না মেনে এক জায়গা থেকে বেশি ও অন্য জায়গা থেকে কম পলি তুললে নদীর প্রাকৃতিক গতিপথ ও গতি প্রকৃতি বদলে যেতে পারে। এছাড়া অপসারিত পলি ব্যবহারের ক্ষেত্রগুলোও কঠোর নজরদারিতে রাখতে হবে যাতে মাটি বা পরিবেশের গুণমান নষ্ট না হয়। বিশেষ করে পলি তোলার কাজে নিয়োজিত বেসরকারি সংস্থাগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, সময় ও অর্থ বাঁচাতে ঠিকাদাররা প্রায়শই নদী বা জলাশয়ের মাঝখান থেকে পলি না তুলে তীর বা কিনারা থেকে মাটি তুলে থাকে, যা নদীর জন্য চরম ক্ষতিকর হতে পারে।
সূত্র: ইটিভি ভারত





