রাজধানীর শনির আখড়ায় প্রেমিকের প্ররোচনায় বর্ণমালা স্কুল ও কলেজের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনায় মামলা করেছে তার পরিবার। তবে মামলা হলেও অভিযুক্তদের কাউকেই গ্রেপ্তার করছে না পুলিশ- অভিযোগ ওই শিক্ষার্থীর বাবা-মায়ের।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর শনির আখড়া জিয়া স্মরণী রোডের ঢাকা শপিং টাওয়ারে এ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ওই শিক্ষার্থীর মা শিল্পী সরকার বাদী হয়ে কদমতলী থানায় একটি মামলা করেন।
আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীর মা শিল্পী সরকার বলেন, গত ফ্রেব্রুয়ারি মাসের ২৮ তারিখে মামলা করলেও পুলিশ এখনো কোনো আসামিকেই ধরতে পারেনি।
তিনি বলেন, একজন গ্রেপ্তার করতে পারলে আরেকজনকেও পাওয়া যাবে। অথচ পুলিশ আমাদেরকে আসামিদের বাড়িতে গিয়ে জানতে বলে তারা কোথায় আছে।
শিল্পী সরকার আরো বলেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাব-ইন্সপেক্টর ছাইদুল ইসলাম মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলতেও নিষেধ করেছেন। তিনি বলছেন, হিন্দু মানুষ তো বোকা হয়, মিডিয়াকে কেন জানান, সাংবাদিকরা কি করতে পারবে?
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, আত্মহত্যাকারী রাজধানীর বর্ণমালা স্কুল ও কলেজের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর শনির আখড়া জিয়া স্মরণী রোডের ঢাকা শপিং টাওয়ারে তাদের ফ্ল্যাটের রুমে স্বর্ণা সরকার দরজা বন্ধ করে ঘুমাতে যায়। পরে তার আর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে দরজা ভেঙে ঢুকে দেখি আমার মেয়ে শাড়ী দিয়ে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে আছে। আমার মেয়ে বেঁচে আছে ভেবে ঝুলন্ত অবস্থা থেকে নামিয়ে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়ার সময় পথেই মারা যায়। পরে আমরা তাকে বাসায় নিয়ে আসি। পরে কদমতলী থানা পুলিশ খবর পেয়ে সুরতহাল রিপোর্ট করতে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ মর্গে পাঠায়।
এজাহারে শিল্পী সরকার আরো জানান, তার মেয়ে স্বর্ণা সরকারের সঙ্গে তার স্বামীর চাচাতো বোনের ছেলে জয়ন্ত সরকারের (২৬) সঙ্গে ২০১৯ সালের মার্চ থেকে প্রেমের সম্পর্ক ছিলো। পরে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে যাত্রাবাড়ী এলাকার বিনয় সরকারের ছেলে সঞ্জিত সাহার (২৩) সঙ্গে পরিচয় হয় এবং বিভিন্ন সময় তাদের মধ্যে ফোনে কথা হয়। পরে বিষয়টি জানতে পেরে সঞ্জিত ও জয়ন্তকে আমার মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করি। এতে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে আমার মেয়েকে বিভিন্ন সময় উত্ত্যক্ত করতে শুরু করে। এমনকি তাদের সঙ্গে সম্পর্ক না করলে মেয়েকে মেরে ফেলার হুমকিও দিতো তারা। এছাড়াও তারা আমার মেয়েকে বিভিন্ন সময় আত্মহত্যার প্ররোচনা করতো।
এ মামলার দুই অভিযুক্তের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে এক নম্বর অভিযুক্ত সঞ্জিত সাহার মোবাইল ফোন এখনো সচল পাওয়া যায়, তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে মামলার অপর অভিযুক্ত জয়ন্ত সরকার বলেন, ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিলো। সে আমার রিলেটিভ ছিলো। সে মারা যাওয়ার বিষয়টি আমি শুনেছি। তবে এক বছরেরও বেশি সময় আগে তার সাথে আমার সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়।
সম্পর্ক শেষ হবার পরেও বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীকে ব্লাকমেইল করেছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে জয়ন্ত সরকার বলেন, তার সাথে আমার কথাই হতো না। একটা ঝামেলার কারণে ৭-৮ মাস আগে একবার কথা হয়েছিলো, তারপর আর কথা হয়নি।
সঞ্জিত সাহাকে চিনেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি শুনেছিলাম এই নামের একটা ছেলের সাথে তার সম্পর্ক ছিলো। এর বেশি কিছু জানি না।
এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কদমতলীর থানার সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) ছাইদুল ইসলাম বলেন, বাদী পক্ষের অভিযোগ ভিত্তিহীন, এটা তারা প্রমাণ করে দেখাক।
অভিযুক্তরা পলাতক কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, যেহেতু গ্রেপ্তার হয়নি সেহেতু আসামিরা পলাতক।
হঠাৎ করেই রেগে গিয়ে এসআই ছাইদুল ইসলাম বলেন, আপনি আসামিকে ধরিয়ে দেন এর জন্য যা খেতে চান আমি খাওয়াবো।
তিনি আরো বলেন, আমরা আসামির সব তথ্য নিয়েই গ্রেপ্তার করবো। একজন নিরীহ মানুষকে গ্রেপ্তার করে হয়রানি কেনো করবো।
মারা যাওয়া শিক্ষার্থীর মা শিল্পী সরকার বলেন, বিভিন্ন সময় অভিযুক্ত সঞ্জিত সাহা তার মেয়ের কাছ থেকে নগদ টাকাসহ প্রায় ১২ ভরি স্বর্ণ হাতিয়ে নেয়। মেয়েকে ভয় দেখিয়ে মানসিক নির্যাতন করতো। তার ছোট মেয়ের কাছেও ফোন করে হত্যার হুমকি দিয়েছে বলেও জানান শিল্পী সরকার।
এমন অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে মারা যাওয়া শিক্ষার্থীর ফেসবুক মেসেঞ্জার থেকে। সেখানে দেখা যায়, অভিযুক্ত সঞ্জিত সাহা কুরুচিপূর্ণ শব্দ লিখে তাকে মরে যাওয়ার জন্য বলতো। এমনকি মরে যাওয়ার পর পুলিশ তাকে ধরবে বলেও মজা করতো।
সঞ্জিতের মেসেজ থেকে আরো দেখা যায়, বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীকে তার বাসায় যাওয়ার জন্য চাপ দিতো, জবাবে শিক্ষার্থী বাসায় যেতে না চাইলে অনেক খারাপ হবে এমন ভয় দেখাতো। এর মধ্যে টাকাও চাইতো সঞ্জিত। এছাড়াও বিভিন্ন সময় তার কাছে ভিডিও চাইতো সঞ্জিত সাহা।





