যে দুই অঙ্গের পাপ ধ্বংসের অন্যতম কারণ

মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীবের মর্যাদা দিয়েছেন। তাদের সুন্দরতম গঠনে সৃষ্টি করেছেন। তাদের এমন ভাবে সৃষ্টি করেছেন যে তারা অন্য সব মাখলুকের উপর রাজত্ব করতে পারে। মানুষকে মহান আল্লাহ যেসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান করেছেন, তার মধ্যে দুটি অঙ্গ বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১. জিহ্বা ও ২. লজ্জাস্থান। এ দুটি অঙ্গের সঠিক ব্যবহার যেমন মানুষের মর্যাদা, ইজ্জত ও জান্নাত লাভের মাধ্যম হতে পারে, তেমনি এগুলোর অপব্যবহারে তার দুনিয়া ও আখিরাত ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তাই ইসলাম এ দুটি অঙ্গ সংরক্ষণের ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছে।

হাদিস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার দু’চোয়ালের মাঝের বস্তু (জিহ্বা) এবং দুই উরুর মাঝখানের বস্তু (লজ্জাস্থান) এর জামানত আমাকে দিবে, আমি তাঁর জান্নাতের জিম্মাদার।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪৭৪)

সাধারণত এই দুটি অঙ্গ দিয়েই মানুষ জঘন্য জঘন্য পাপে লিপ্ত হয়। অথচ মানুষ মুখ দিয়ে যা বলে, সব তাত্ক্ষণিক লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে কথাই মানুষ উচ্চারণ করে (তা সংরক্ষণের জন্য) তার নিকটে একজন সদা তত্পর প্রহরী আছে।’ (সুরা কাফ, আয়াত : ১৮)

অতএব মানুষ তার জিহ্বাকে ব্যবহার করে গিবত, চোগলখুরি, গালিগালাজ, অপবাদ, মিথ্যা কথা, নাশোকরিমূলক উক্তি ও এ জাতীয় অন্যান্য যে পাপাচারেই লিপ্ত হয়, সবই সংরক্ষিত হয়ে যায়। যেগুলোর পরিণতি খুবই ভয়াবহ। পবিত্র কোরআন গিবতকে মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করার সঙ্গে তুলনা করেছে। (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১২)
চোগলখোরদের বিশ্বাস করতে নিষেধ করা হয়েছে। (সুরা কলম, আয়াত : ১১)। এমনি ভাবে মিথ্যা, অপবাদ, গালাগালেরর ভয়াবহতা নিয়ে বহু আয়াতে সতর্ক করা হয়েছে।

মানুষের মুখের কথা খুবই তাত্পর্যপূর্ণ বিষয়। কখনো কখনো একটি কথার কারণে মানুষের অনেক বড় বিপদ নেমে আসতে পারে, তার দুনিয়া-আখিরাত ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছেন যে, নিশ্চয় বান্দা পরিণাম চিন্তা ব্যতিরেকেই এমন কথা বলে যে কথার কারণে সে ঢুকে যাবে জাহান্নামের এমন গভীরে যার দূরত্ব পূর্ব-পশ্চিমের দূরত্বের চেয়েও বেশি। (বুখারি, হাদিস : ৬৪৭৭)

এই জন্য আল্লাহ মুখের জোর দিলেই তা দিয়ে মানুষকে হেয় করা, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, ঝগড়া করা, গালাগাল দেওয়া ও মিথ্যা ও কুফরি কথা বলার সুযোগ নেই।

অন্যদিকে লজ্জাস্থানের পাপ মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে দেয়। এজন্য ইসলাম ব্যভিচারকে শুধু হারামই করেনি; বরং তার নিকটবর্তী হওয়ার পথও নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ।’ (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৩২)

মুমিন কখনো এই পথে পা বাড়াতে পারে না। পবিত্র কোরআনে মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে আল্লাহ বলেন, ‘আর তারা নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজতকারী।’ (সুরা মুমিনূন, আয়াত : ৫)

কিয়ামতের দিন যেসব অঙ্গের পাপের কারণে সবচেয়ে বেশি মানুষ জাহান্নামে যাবে, তার মধ্যে অন্যতম হলো, এই দুটি অঙ্গ। রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কোন জিনিস মানুষকে সবচেয়ে বেশি জাহান্নামে নিক্ষেপ করে? তিনি উত্তর দেন, ‘মুখ এবং লজ্জাস্থান।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২০০৪)

বস্তুত জিহ্বা ও যৌন প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণই তাকওয়ার অন্যতম পরিচায়ক। যে ব্যক্তি গিবত, মিথ্যা, অপবাদ, অশ্লীল ভাষা ও কু-কথা থেকে নিজেকে রক্ষা করে এবং ব্যভিচার ও অশ্লীলতার সব পথ বন্ধ রাখে, সে নিজের ঈমান, সম্মান ও আখিরাতকে নিরাপদ রাখে। আর যে ব্যক্তি এ দুটি অঙ্গকে লাগামহীন ছেড়ে দেয়, সে নিজের হাতে নিজের ধ্বংস ডেকে আনে। তার পাপে দুনিয়া-আখিরাত ভারি হয়ে উঠে। যাকে তার উভয় জাহানের লাঞ্ছনাকে তরান্বিত করে। তাই প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য হলো সর্বদা জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের হেফাজত করা; কেননা এ দুটির সঠিক ব্যবহার জান্নাতের পথ সুগম করে এবং অপব্যবহার জাহান্নামের দিকে ঠেলে দেয়।