ইসলামের দৃষ্টিতে বীরত্ব কেবল শারীরিক শক্তি বা প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার নাম নয়; বরং নিজের নফস, ক্রোধ ও প্রতিশোধস্পৃহাকে নিয়ন্ত্রণ করার মধ্যেই প্রকৃত বীরত্ব নিহিত। যে ব্যক্তি ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিশোধ নেয় না, অন্যায় আঘাত থেকে বিরত থাকে এবং ক্ষমার মহত্ত্ব প্রদর্শন করে, সে-ই আল্লাহর কাছে সত্যিকারের বীর।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ রাগ সংবরণকারীদের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে ব্যয় করে এবং ক্রোধ সংবরণ করে ও মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সত্কর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৪)
এই আয়াতে মহান আল্লাহ মুত্তাকী বান্দাদের কিছু গুণ উল্লেখ করেছেন। যার অন্যতম হলো, সর্বাবস্থায় আল্লাহর রাস্তায় ব্যয়, ক্রোধ দমন ও ক্ষমাশীলতা।
অর্থ-সম্পদ, পদ-পদবী ইত্যাদি ব্যবহার করে মানুষকে দমন করা সহজ। সাধারণ মানুষ এদের সামনা সামনি সম্মান করলেও মন থেকে ভালোবাসে না। ইসলামের চোখেও এ ধরনের শক্তিকে ভালো চোখে দেখা হয় না।
হাদিস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রকৃত বীর সে নয়, যে কাউকে কুস্তিতে হারিয়ে দেয়। বরং সেই প্রকৃত বাহাদুর, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। (বুখারি, হাদিস : ৬১১৪)
এই হাদিস আমাদের শেখায়, বাহ্যিক জয় নয়; অন্তরের নিয়ন্ত্রণই আসল জয়। ক্রোধ মানুষের বিবেককে আচ্ছন্ন করে, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য মুছে দেয়। তাই ক্রোধ সংযম মানে নিজের উপর বিজয় অর্জন। আর যে এই শক্তি অর্জন করতে পারে, পৃথিবীর কোনো শক্তি তাকে নৈতিক ভাবে হারাতে পারে না।
সে এর বিনিময়ে মহান আল্লাহর কাছে উত্তম প্রতিদান পায়। আল্লাহর সন্তুষ্টি পায়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ। অতঃপর যে ক্ষমা করে দেয় এবং আপোস নিষ্পত্তি করে, তার পুরস্কার আল্লাহর নিকট রয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ জালিমদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা আশ-শূরা, আয়াত : ৪০)
অতএব, ক্ষমতা থাকলেই কাউকে আঘাত করা যাবে না। বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় ক্ষমা করে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
যেমন ইউসুফ (আ.)-এর কথাই ধরা যাক। তাঁর ভাইয়েরা তাঁর সঙ্গে কেমন আচরণ করেছিল? তারা তাঁকে কুয়ায় ফেলেই ক্ষান্ত হয়নি; তাকে গোলাম হিসেবে বিক্রিও করে দিয়েছিল, যার দরুন তাঁকে নারীদের চক্রান্তের শিকার হতে হয়েছিল। ভোগ করতে হয়েছিল দীর্ঘ কারাবাস। এতদসত্ত্বেও তিনি ভাইদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগস্বরূপ একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি।
সর্বোচ্চ উদারতার সঙ্গে বলে দিয়েছিলেন- ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ আনা হবে না। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। তিনি সকল দয়ালু অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ দয়ালু। (সুরা ইউসুফ, আয়াত : ৯২)
মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনেও এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল। যেদিন মক্কা বিজয় হয়েছিল, মক্কার অধিবাসীরা ভয়ে একেবারে মুহ্যমান হয়ে পড়েছিল। ইসলামের মূলোতপাটনে যারা নেতৃত্বভার গ্রহণ করেছিল, অশ্লীল ভাষায় মহানবী (সা.)-কে অজস্র গালাগাল করত, বিষাক্ত বর্শা হাতে তাঁকে হত্যা করতে ওত পেতে থাকত, তাঁর দেহ মুবারক থেকে রক্ত ঝরাত, নামাজে নাড়িভুঁড়ি চাপা দিত, মাতৃভূমি ত্যাগ করতে যারা বাধ্য করেছিল, আজ তারা সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় দলে দলে কাবা প্রাঙ্গণে সমবেত হলো।
আজ তাদের সেই দর্প, গর্ব ও আস্ফালন নেই। ১০ হাজার মুসলিম বাহিনী দ্বারা বেষ্টিত হয়ে আজ তারা শিয়ালের মতো লেজ গুটিয়ে দুরুদুরু বুকে চেয়ে আছে দয়ার সাগর মহানবী (সা.)-এর ফয়সালার দিকে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কা নগরে প্রবেশের দুটি পথ দিয়েই সৈন্য প্রবেশ করানোর সিদ্ধান্ত নেন। খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনীকে মক্কার নিচু পথে
নগরে প্রবেশের নির্দেশ দেন। অবশিষ্ট বাহিনী নিয়ে স্বয়ং রাসুল (সা.) মক্কার উঁচু পথ ধরে নগরে প্রবেশ করেন।
বিনা বাধায় রক্তপাতবিহীন তিনি হাজুন নামক স্থানে পৌঁছে বিজয় পতাকা উড্ডয়ন করানোর নির্দেশ দেন।
তিনি সরাসরি চলে যান কাবাগৃহে। একপর্যায়ে মহানবী (সা.) কাবাঘর থেকে বের হয়ে এলেন। তিনি দরজার উভয় পাশের কপাটে হাত রেখে এক নাতিদীর্ঘ হৃদয়গ্রাহী ভাষণ দেন। তিনি বলেন, ‘তোমাদের প্রতি আজ কোনো অভিযোগ নেই। যাও! তোমরা সবাই মুক্ত।’ শুধু তা-ই নয়, কাফির নেতা আবু সুফিয়ানের গৃহে যে ব্যক্তি আশ্রয় নেবে, তাকেও তিনি ক্ষমা করেন। তিনি ঘোষণা করেন, ‘যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের বাড়িতে আশ্রয় নেবে, সে নিরাপদ থাকবে।’ (আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৪০৫, ৪০১)
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে মহানবী (সা.)-এর এই আদর্শ অনুসরণের তাওফিক দান করুন। আমিন।





