স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন ঘিরে বিএনপির বিভিন্ন স্তরে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। দলীয় কার্যক্রম আরও গতিশীল করা, তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে নতুন নেতৃত্ব আনতে যাচ্ছে বিএনপি। নেতৃত্ব সংগঠনের ভেতর থেকে আসবে, নাকি পদবঞ্চিত ত্যাগীদের থেকে আনা হবে; মূলত এ নিয়ে আলোচনা চলছে। সরকারের পাশাপাশি রাজপথেও যুগোপযোগী কার্যক্রম পরিচালনা করে সরকারকে সর্বোচ্চ সমর্থন দেওয়ার সংকল্প তাদের। এ লক্ষ্যে নতুন করে ঢেলে সাজানো হচ্ছে জাতীয়তবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলকে। ইতোমধ্যে পদপ্রত্যাশী নেতাদের মধ্যে ব্যাপক লবিং-তদবির শুরু হয়েছে।
বিএনপির একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। দলের হাইকমান্ড সম্ভাব্য শীর্ষ নেতাদের সাংগঠনিক সক্ষমতা, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, তৃণমূল গ্রহণযোগ্যতা এবং অতীত রাজনৈতিক ত্যাগের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে যাচাই-বাছাই করছে।
দলের অভ্যন্তরে ‘এক নেতার এক পদ’ এই নীতি কঠোরভাবে অনুসরণের আলোচনা থাকায় এবারের কমিটিতে বড় ধরনের চমক থাকতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বর্তমান কমিটির শীর্ষ দুই পদ থেকে নতুন কমিটিতে কাউকে না রাখার আলোচনা নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর তিন বছর মেয়াদি কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই কমিটির মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হওয়ায় নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আগ্রহ এখন তুঙ্গে।
সংগঠনের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, সম্প্রতি বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় নেতারা। ওই বৈঠকে কমিটি পুনর্গঠন, ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন এবং মাঠপর্যায়ে সক্রিয় নেতৃত্বকে সামনে আনার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে গুরুত্ব পায় দীর্ঘদিন বিগত সরকার আমলে রাজপথে সক্রিয় থাকা, হামলা-মামলা, জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েও যারা সংগঠনকে ধরে রেখেছেন, তাদের মূল্যায়নের বিষয়টি। একই সঙ্গে নতুন, পুরোনো ও বঞ্চিত নেতাদের সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কমিটি গঠনের বিষয়েও ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এমন বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ও ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি মোহাম্মদ জাকারিয়া আলম মামুনের নাম।
দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, তৃণমূলের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক দুঃসময়ে মাঠে থাকার কারণে তৃণমূল নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ তাকে সেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ দুই পদের যেই কোন একটিতে দেখতে চান। কারণ, অতীতের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে প্রত্যাশিত মূল্যায়ন না পেলেও এবার ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতৃত্বকে সামনে আনার নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে জাকারিয়া আলম মামুন শীর্ষ নেতৃত্বের বিবেচনায় রয়েছেন।
বিশেষ করে বিএনপির দুঃসময়ে ধারাবাহিকভাবে রাজপথে সক্রিয় থাকা, বিভিন্ন আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া এবং সাংগঠনিক যোগাযোগ ধরে রাখার কারণে তিনি এখন হাইকমান্ডের বিবেচনায় শক্ত অবস্থানে রয়েছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কমিটি পুনর্গঠন করা হবে কি না, এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মোহাম্মদ জাকারিয়া আলম মামুন বলেন, ‘সংগঠনের কমিটি পুনর্গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। যারা ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন জেল-জুলুম-নির্যাতন ও গুমের শিকার হয়েও রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন, তাদের মধ্য থেকেই নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হবে বলে প্রত্যাশা করছি। যাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাদের সাংগঠনিক দক্ষতা বিবেচনায় এনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান অবশ্যই সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি যেই সিদ্ধান্ত দেবেন, সেই সিদ্ধান্তের প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল ও অনুগত থাকব।’
শীর্ষ পদে আলোচনায় আরও যাদের নাম আলোচনায় রয়েছে তারা হলেন স্বেচ্ছাসেবক দলের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইয়াছিন আলী, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক সাদরেজ জামান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম নোমান, সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান সহসভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিন এবং ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি শেখ ফরিদ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি জহির উদ্দিন তুহিন,যুগ্ম সম্পাদক ফয়েজউল্লাহ ফয়েজ, যুগ্ম সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রফিক এবং যুগ্ম সম্পাদক কাজী মুক্তার হোসেন। পাশাপাশি ছাত্রদলের সাবেক নেতাদের মধ্য থেকেও নতুন কমিটির নেতৃত্ব আসতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। সম্ভাব্যদের মধ্যে রয়েছেন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ, সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রাশেদ ইকবাল খান এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল।
স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি প্রসঙ্গে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘সারা দেশে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে। যেসব কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে, সেগুলো একে একে পুনর্গঠন করা হবে। সেখানে ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়ন করা হবে। তৃণমূল নেতাকর্মী ও মাঠের রাজনীতির সঙ্গে যাদের সম্পর্ক রয়েছে, তারাই কমিটিতে স্থান পাবেন বলে বিশ্বাস আছে।’
এ নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক দল দক্ষিণের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম নোমান বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছর যারা আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে ছিলেন, জুলুম-নির্যাতন সহ্য করেছেন এবং তৃণমূলকে সংগঠিত করে দলকে শক্তিশালী করতে পারবেন, তাদেরকে বিএনপি চেয়ারম্যান মূল্যায়ন করবেন বলে আমার প্রত্যাশা।’
যুগ্ম সম্পাদক ফয়েজউল্লাহ ফয়েজ বলেন, ‘মেধাবী, ত্যাগী ও সাংগঠনিক দক্ষ নেতৃত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়দের দিয়ে কমিটি গঠন করা হলে সংগঠনে নতুন গতি ফিরে আসবে।’
দলীয় নেতাকর্মীদের মতে, এবারের কমিটিতে ত্যাগী, পরিচ্ছন্ন ইমেজের এবং মাঠপর্যায়ে পরীক্ষিত নেতৃত্বকে মূল্যায়ন করা হলে সংগঠনে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হবে। সেই বিবেচনায় সভাপতি বা সাধারণত সম্পাদকের মত পদে মোহাম্মদ জাকারিয়া আলম মামুন এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন বলে জানা গেছে।





