দুবাইয়ে গ্রেপ্তার বেনজীরকে দেশে ফেরানো কতটা সহজ?

দুর্নীতির মামলায় ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। সংসদে দেওয়া এক বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ফেডারেল ক্রিমিনাল পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (আবুধাবি) বাংলাদেশ সরকারকে ই-মেইলের মাধ্যমে বিষয়টি অবহিত করে। ওই বার্তায় বলা হয়, দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে দেশটিতে আটক আছেন।

অনিয়ম–দুর্নীতির মামলায় দেশ থেকে গোপনে পালানোর পর বেনজীরের গ্রেপ্তারের খবরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে— তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা কতটা সহজ হবে। কারণ, বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ থাকা মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রত্যর্পণ নয়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তাকে গ্রেপ্তার করা একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে জটিল ও দীর্ঘ। এটি মূলত সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, আদালতের সিদ্ধান্ত, মামলার নথিপত্রের গ্রহণযোগ্যতা, দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর নির্ভর করে।

রেড নোটিশ বনাম অতীত অভিজ্ঞতা
ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন (ইন্টারপোল) একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, যার প্রধান কাজ সদস্য দেশগুলোর পুলিশকে সহায়তা করা। সদস্য দেশগুলোর পক্ষে ইন্টারপোলের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় করে ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি)। বাংলাদেশের পুলিশ সদর দপ্তরে অবস্থিত এনসিবি আন্তর্জাতিক অপরাধী ও পলাতক ব্যক্তিদের তথ্য আদান-প্রদান ও গ্রেপ্তারে কাজ করে।

ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে উল্লেখিত তথ্যমতে— শীর্ষ সন্ত্রাসী, হত্যা মামলার আসামি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলার পলাতক দণ্ডিত ও নানা মামলার পলাতক আসামিসহ ‘রেড নোটিশের’ তালিকায় ৫৯ বাংলাদেশির নাম রয়েছে। কিন্তু তাদের অধিকাংশকেই এখন পর্যন্ত দেশে ফেরানো সম্ভব হয়নি।

জানা যায়, এখন তাকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি শুরু হবে ‘মিনিস্ট্রি টু মিনিস্ট্রি’ অর্থাৎ স্বরাষ্ট্র হয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে। এরপর আদালত ও কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ তো আছেই। ফলে হয়তো তাকে ফেরানো যাবে, তবে সহসা ফেরানো কঠিন।”

৩০ দিনের ডেডলাইন ও আইনি প্রক্রিয়া
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ রোববার সংসদে জানিয়েছেন, এনসিবি আবুধাবি স্পষ্ট করেছে যে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ‘ফেডারেল ল নম্বর ৩৯ অব ২০০৬’ অনুযায়ী গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট (প্রত্যর্পণ প্রস্তাব) প্রেরণ করতে হবে।
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ এবং ১০৯ সেকশন; ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ সেকশনের ৫(২), ২৬(২) ও ২৭(১) ধারা এবং বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার ১৯৭৩-এর ১১ ধারার সেকশন ১১ অনুযায়ী মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক প্রত্যর্পণের জন্য প্রয়োজনীয় মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও তদন্ত সংক্রান্ত দলিলাদি প্রস্তুত করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক এক্সট্রাডিশন প্রপোজাল প্রস্তুত ও অনুমোদন সাপেক্ষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইউএই কর্তৃপক্ষের কাছে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক আবেদন পাঠানো হবে এবং এনসিবি আবুধাবির সঙ্গে সমন্বয়পূর্বক অতি দ্রুতই তাকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হবে।

রেড নোটিশ মানেই কি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা?
অনেকেই রেড নোটিশ ও আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানাকে এক করে দেখেন, কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন ও ইন্টারপোলের ভাষায় দুটি ভিন্ন বিষয়। রেড নোটিশ হলো ইন্টারপোলের একটি আন্তর্জাতিক সতর্কতা ব্যবস্থা। কোনো দেশের আদালত বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি কোনো পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তার করে প্রত্যর্পণ করতে চায়, তখন ইন্টারপোলের মাধ্যমে এই নোটিশ জারির আবেদন করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য পলাতক আসামির অবস্থান শনাক্ত করা, সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে সতর্ক করা এবং তাকে সাময়িকভাবে আটক করার সুযোগ তৈরি করা। তবে, এটি কোনো বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়; এটি কেবল সদস্য দেশগুলোর প্রতি একটি ‘অনুরোধ’। কোনো দেশ চাইলে এর ভিত্তিতে কাউকে আটক করতে পারে, আবার নিজেদের আইন অনুযায়ী নাও করতে পারে।

বাংলাদেশকে যা প্রমাণ করতে হবে
এনসিবি-তে কাজ করা একজন কর্মকর্তা জানান, বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরাতে হলে প্রধানত চারটি বাধা অতিক্রম করতে হবে। এক. মামলার প্রকৃতি, দুই. বিচারিক চ্যালেঞ্জ, তিন. আদালতের অনুমোদন এবং চার. কূটনৈতিক সমন্বয়।

প্রথমত, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আদালত দেখবে অভিযোগগুলো উভয় দেশেই অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত কি না, যাকে ‘ডুয়াল ক্রিমিন্যালিটি প্রিন্সিপাল’ (Dual Criminality Principle) বলা হয়। দুর্নীতি, জালিয়াতি, মানি লন্ডারিং বা অবৈধ সম্পদের মতো অভিযোগগুলো সাধারণত এই পরীক্ষায় শক্ত অবস্থানে থাকে। তবে, বেনজীর আহমেদের আইনজীবীরা আদালতে দাবি করতে পারেন যে, এই মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা এর বিচার প্রক্রিয়া ত্রুটিপূর্ণ। সেক্ষেত্রে আমিরাত সরকার চাইলেই কাউকে হস্তান্তর করতে পারে না, এর জন্য আদালতের চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রয়োজন হয়— যোগ করেন তিনি।