কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে স্বপ্নপূরণের যে গল্প লিখেছিলেন লিওনেল মেসি, নতুন বিশ্বকাপের শুরুতেও যেন সেই গল্পেরই নতুন অধ্যায় রচনা করলেন তিনি। বয়স ৩৮, সামনে ৩৯–এ পা দেওয়ার অপেক্ষা! সাম্প্রতিক সময়ে চোটের সঙ্গে লড়াইও করতে হয়েছে। কিন্তু মাঠে তার ছাপ দেখে তা বোঝার কোনো উপায় নেই। কানসাসে আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ মিশনের প্রথম ম্যাচে একক নৈপুণ্যে আলো ছড়িয়েছেন এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা। করেছেন দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিক, আর তার হাত ধরেই ৩-০ গোলের জয় দিয়ে শিরোপা রক্ষার অভিযান শুরু করেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা!
বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে ষষ্ঠবারের মতো মাঠে নামার রেকর্ড গড়তে নেমেছিলেন মেসি। একই সঙ্গে এটি ছিল তার ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। এমন একটি বিশেষ দিনে তিনি যে নিজেকে স্মরণীয় করে রাখবেন, তার ইঙ্গিত মিলেছিল ম্যাচের শুরু থেকেই।
খেলা শুরুর দ্বিতীয় মিনিটেই নিজেদের অর্ধে নেমে এসে রক্ষণভাগকে সহায়তা করতে দেখা যায় আর্জেন্টাইন অধিনায়ককে। কয়েক মিনিট পরই তিনি জানান দেন আক্রমণভাগেও কতটা ভয়ংকর হতে পারেন। ম্যাচের পঞ্চম মিনিটে আলজেরিয়ার রক্ষণভাগকে ফাঁকি দিয়ে গোলরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে চিপ শটে বল জালে জড়ান তিনি। তবে সহকারী রেফারির পতাকা ওঠায় গোলটি বাতিল হয়ে যায়।
প্রথম দিকে কিছুটা ধীরগতিতে খেলছিল আর্জেন্টিনা। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অষ্টম মিনিটে পাল্টা আক্রমণে এগিয়ে গিয়ে গোলও করে বসেছিল আলজেরিয়া। মাঝমাঠ থেকে পাওয়া পাস ধরে ফারেস শাইবি বল পাঠান আর্জেন্টিনার জালে। কিন্তু ভিএআরের পর্যালোচনায় অফসাইড ধরা পড়ায় সেই গোলটিও বাতিল হয়ে যায়।
এই নাটকীয়তার পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় আর্জেন্টিনা। আর ১৭ মিনিটে আসে সেই মুহূর্ত, যার জন্য অপেক্ষা করছিল হাজারো সমর্থক। মাঝমাঠ থেকে রদ্রিগো দি পলের নিখুঁত পাস পেয়ে সামনে এগিয়ে যান মেসি। ডি-বক্সের অনেকটা বাইরে, প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে বাঁ পায়ের দুর্দান্ত শটে বল পাঠান গোলমুখে। আলজেরিয়ার গোলরক্ষক লুকা জিদান বল স্পর্শ করলেও সেটিকে থামাতে পারেননি। বল জালে জড়াতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে আর্জেন্টিনা শিবির।
গোলটি ছিল আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির ১১৮তম আন্তর্জাতিক গোল এবং বিশ্বকাপে তার ১৪তম গোল। একই সঙ্গে ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচে নিজের নামের পাশে যোগ করেন আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়।
প্রথমার্ধে আরও কয়েকটি সুযোগ তৈরি করলেও ব্যবধান বাড়াতে পারেনি আর্জেন্টিনা। তবে দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নেমে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে লিওনেল স্কালোনির দল।
ম্যাচের ৬০ মিনিটে আসে মেসির দ্বিতীয় গোল। আক্রমণের সূচনা করেছিলেন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। নিজেদের অর্ধ থেকে অনেক দূরে উঠে এসে তিনি সতীর্থদের উদ্দেশে বল বাড়ান। কয়েক দফা পাসের পর বল পৌঁছে যায় অ্যালেক্সিস ম্যাক-অ্যালিস্টারের কাছে। তার নেওয়া শট নিয়ন্ত্রণে নিতে ব্যর্থ হন আলজেরিয়ার গোলরক্ষক লুকা জিদান। ফিরতি বল পেয়ে এক মুহূর্তও দেরি করেননি মেসি। ঠান্ডা মাথায় বল জালে পাঠিয়ে আর্জেন্টিনাকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন তিনি।
এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ১৫-তে নিয়ে যান মেসি। ফলে তিনি ছুঁয়ে ফেলেন ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিওকে। তার সামনে তখন ছিলেন কেবল জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসা, যার বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা ১৬।
কিন্তু মেসির চমক তখনো শেষ হয়নি!
ম্যাচের ৭৬ মিনিটে আবারও জ্বলে ওঠেন তিনি। আর্জেন্টিনার দ্রুতগতির আক্রমণ থেকে পাওয়া সুযোগ কাজে লাগিয়ে দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে পূর্ণ করেন নিজের হ্যাটট্রিক। বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে এটিই তার প্রথম হ্যাটট্রিক। একই সঙ্গে গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১৬-তে, যা তাকে নিয়ে যায় জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার সঙ্গে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকার যৌথ শীর্ষে।
এর আগে দীর্ঘ বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে অসংখ্য রেকর্ড গড়লেও কখনো হ্যাটট্রিকের দেখা পাননি মেসি। সেই আক্ষেপও ঘুচল ষষ্ঠ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই।
হ্যাটট্রিক পূর্ণ করার কিছুক্ষণ পর, ৮০ মিনিটে তাকে মাঠ থেকে তুলে নেন কোচ স্কালোনি। মাঠ ছাড়ার সময় পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে অভিবাদন জানায় আর্জেন্টাইন অধিনায়ককে। সেই দৃশ্য যেন তার ক্যারিয়ারের আরেকটি স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে রইল।
ম্যাচ শেষে পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বকাপ ইতিহাসে এখন সর্বোচ্চ ১৬ গোল করে যৌথভাবে শীর্ষে রয়েছেন মিরোস্লাভ ক্লোসা ও লিওনেল মেসি। আর মাত্র একটি গোল করলেই এককভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসবেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন বয়স, ফিটনেস ও ধারাবাহিকতা নিয়ে। কিন্তু আলজেরিয়ার বিপক্ষে ৯০ মিনিটের পারফরম্যান্সে মেসি যেন সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিলেন। তিনি এখনো আর্জেন্টিনার প্রাণভোমরা, এখনো দলের সবচেয়ে বড় ভরসা।
বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখার মিশনে আর্জেন্টিনার যাত্রা শুরু হলো দুর্দান্ত এক জয় দিয়ে। আর সেই যাত্রার প্রথম অধ্যায়ে সবচেয়ে উজ্জ্বল নামটি নিঃসন্দেহে লিওনেল মেসি। ইতিহাসের আরেকটি রেকর্ড ভাঙার অপেক্ষায় থাকা এই কিংবদন্তি জানিয়ে দিলেন, তার জাদু এখনো ফুরিয়ে যায়নি!





