চট্টগ্রামের মাঠে বাংলাদেশের সামনে ছিল নতুন শুরুর গল্প লেখার সুযোগ! নতুন অধিনায়ক, নতুন সিরিজ, আর প্রতিপক্ষ হিসেবে সদ্য ওয়ানডে সিরিজে হারানো অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু ক্রিকেটের ছোট সংস্করণে গল্পটা লেখা হলো ভিন্নভাবে। শুরুতে সম্ভাবনার আলো দেখিয়েও মাঝপথে পথ হারাল বাংলাদেশ। আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ৪ উইকেটের জয় তুলে নিয়ে টি-টোয়েন্টি সিরিজে এগিয়ে গেল অস্ট্রেলিয়া!
চোটের কারণে আজ লিটন দাসের অনুপস্থিতিতে নেতৃত্বের ভার ওঠে তাওহীদ হৃদয়ের কাঁধে। অধিনায়ক হিসেবে প্রথম সিদ্ধান্তেই সাহস দেখিয়েছিলেন তিনি। টস জিতে ব্যাটিং নেওয়ার পেছনে ছিল রান তুলে চাপ তৈরি করার ভাবনা। শুরুটাও সেই পরিকল্পনার পক্ষে যাচ্ছিল।
তানজিদ হাসান তামিম ও সাইফ হাসান খুব বড় কোনো ঝড় না তুললেও ইনিংসকে এগিয়ে নিচ্ছিলেন স্বচ্ছন্দে। ওপেনিং জুটিতে আসে ২৬ রান। তানজিদের বিদায়ের পরও খুব বেশি শঙ্কা তৈরি হয়নি। পাওয়ার প্লে শেষে বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে ছিল ৫২ রান। টি-টোয়েন্টির হিসেবে সেটি ছিল বেশ আশাব্যঞ্জক সূচনা। কিন্তু ম্যাচের মোড় ঘুরে যায় ঠিক সেখান থেকেই।
সাইফ হাসানের বিদায়ের পর বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ যেন একসঙ্গে দিক হারিয়ে ফেলে। দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল অভিজ্ঞদের, কিন্তু কেউই সেটি করতে পারেননি। অধিনায়ক হৃদয় ছক্কা দিয়ে ইনিংস শুরু করেও থেমেছেন ৮ রানে। সৌম্য সরকার কিছুক্ষণ ক্রিজে থাকলেও ইনিংস বড় করতে পারেননি। পারভেজ হোসেন ইমন, শামীম হোসেন পাটোয়ারী কিংবা অভিষিক্ত আবদুল গাফফার সাকলাইন-সবার বিদায় এসেছে এমন সময়ে, যখন দলের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল একটি জুটি।
অস্ট্রেলিয়ার বোলাররা খুব বেশি আগুন ঝরানো বোলিং করেননি। কিন্তু তারা একটি কাজ নিখুঁতভাবে করেছেন-বাংলাদেশকে ভুল করতে বাধ্য করেছেন। অ্যাডাম জাম্পার গুগলি, ম্যাট রেনশোর নিয়ন্ত্রিত স্পিন আর পেসারদের সঠিক লাইন-লেংথের সামনে ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের ব্যাটাররা। ফলাফল, ৫২ রানে ২ উইকেট থেকে একসময় ১০০ রানের আগেই হারিয়ে বসে ৮ উইকেট।
এমন অবস্থায় ইনিংসকে সম্মানজনক জায়গায় নিয়ে যাওয়ার কাজটি করেন শেখ মেহেদী হাসান। মূলত বোলার হিসেবেই পরিচিত এই অলরাউন্ডার ব্যাট হাতে দেখান সবচেয়ে বেশি পরিপক্বতা। অন্যরা যখন উইকেট বিলিয়ে ফিরেছেন, তখন তিনি ঝুঁকি ও দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রেখে খেলেছেন। ২২ বলে অপরাজিত ২৯ রানের ইনিংসটি স্কোরকার্ডে হয়তো খুব বড় কিছু নয়, কিন্তু বাংলাদেশের ইনিংসের প্রেক্ষাপটে সেটিই ছিল সবচেয়ে মূল্যবান অবদান। তার ব্যাটেই ১৩১ রানের সংগ্রহ পায় বাংলাদেশ।
তবে ম্যাচের ভাগ্য তখনই অনেকটা নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। ছোট লক্ষ্য রক্ষার জন্য শুরুতেই উইকেট প্রয়োজন ছিল বাংলাদেশের। শরিফুল ইসলাম সেই কাজটি করেন জশ ইংলিসকে ফিরিয়ে। কিছুক্ষণ পর মুস্তাফিজুর রহমান আউট করেন অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক মিচেল মার্শকে। ৩৮ রানে দুই ওপেনারকে হারিয়ে সফরকারীরা খানিকটা চাপে পড়েছিল।
কিন্তু সেখানেই দৃশ্যপটে আবির্ভাব কুপার কনোলির। ওয়ানডে সিরিজের শেষ ম্যাচে দুর্দান্ত সেঞ্চুরি করা এই তরুণ ব্যাটার যেন নিজের ফর্ম চট্টগ্রামেও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন। শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন তিনি। বাংলাদেশের স্পিনার ও পেসার-কাউকেই আলাদা গুরুত্ব দেননি। ফাঁকা জায়গা খুঁজে রান নেওয়া, সুযোগ পেলে বাউন্ডারি-ম্যাচকে দ্রুত অস্ট্রেলিয়ার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যান তিনি।
ফিফটি থেকে মাত্র ৩ রান দূরে থেমে গেলেও ২৭ বলে ৪৭ রানের ইনিংসটি কার্যত ম্যাচের ফল নির্ধারণ করে দেয়। অভিষিক্ত সাকলাইন তার উইকেট তুলে নিয়ে কিছুটা উত্তেজনা ফেরানোর চেষ্টা করেছিলেন। পরে টিম ডেভিড ও নিখিল চৌধুরীর উইকেটও তুলে নেয় বাংলাদেশ। কিন্তু ততক্ষণে প্রয়োজনীয় সমীকরণ অনেক সহজ হয়ে গেছে।
শেষ দিকে ম্যাট রেনশ ও জোয়েল ডেভিস কোনো ঝুঁকি নেননি। ধীরে-সুস্থে লক্ষ্য ছুঁয়ে ফেলেছেন তারা। ১০ বল হাতে রেখেই জয় নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়ে অস্ট্রেলিয়া।
ওয়ানডে সিরিজ হারার পর টি-টোয়েন্টি সিরিজে ঘুরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। প্রথম ম্যাচেই সেই বার্তার বাস্তব প্রমাণ দিল তারা। আর বাংলাদেশের জন্য এই ম্যাচ রেখে গেল পুরোনো এক প্রশ্ন-ভালো শুরু পাওয়ার পরও কেন মাঝের ওভারে ভেঙে পড়ে ব্যাটিং?
সিরিজ এখনো বাকি। পরের লড়াই ১৯ জুন। কিন্তু প্রথম ম্যাচের পর পরিষ্কার, পরের দুই ম্যাচে ঘুরে দাঁড়াতে হলে শুধু বোলারদের নয়, ব্যাটারদেরও অনেক বড় জবাব দিতে হবে!





