দলের গোল দরকার, তবে সেটা যে তোমাকেই করতে হবে তা নয়: ফ্রান্সের সাবেক ফুটবলার

বিশ্বকাপে নিজেদের প্রত্যাবর্তনটা স্মরণীয় করে রাখল ডিআর কঙ্গো। ৫২ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরে আফ্রিকার দলটি শুধু পর্তুগালের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে পয়েন্টই আদায় করেনি, করেছে বিশ্বকাপ ইতিহাসে নিজেদের প্রথম গোলও। হিউস্টনে বুধবারের ম্যাচে পর্তুগালকে ১-১ গোলে রুখে দিয়ে বড় এক চমক উপহার দিয়েছে তারা।

ম্যাচের শুরুটা অবশ্য পর্তুগালের পক্ষেই ছিল। মাত্র ৫ মিনিট ৩২ সেকেন্ডে জোয়াও নেভেসের হেডে এগিয়ে যায় রবার্তো মার্তিনেজের দল। পেদ্রো নেতোর বাঁ প্রান্ত থেকে ভেসে আসা ক্রসে নিখুঁত ফিনিশিং করেন এই মিডফিল্ডার। দ্রুত গোল পাওয়ার পর মনে হচ্ছিল, ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে অনেক পিছিয়ে থাকা ডিআর কঙ্গোর জন্য কঠিন এক রাত অপেক্ষা করছে।

কিন্তু ম্যাচের চিত্র দ্রুত বদলে যায়। গোল হজমের পর রক্ষণে গুটিয়ে না গিয়ে বরং আরও সাহসী ফুটবল খেলতে শুরু করে ডিআর কঙ্গো। নিউক্যাসলের ফরোয়ার্ড ইওয়ান উইসা ও ওয়েস্ট হ্যামের ডিফেন্ডার অ্যারন ওয়ান-বিসাকাদের নেতৃত্বে তারা বারবার চাপ তৈরি করে পর্তুগালের রক্ষণে।

প্রথমার্ধের যোগ করা সময়েই সেই চাপের পুরস্কার পায় আফ্রিকার দলটি। বাঁ দিক থেকে আসা একটি ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে সমতা ফেরান উইসা। গোলটি ছিল ডিআর কঙ্গোর বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম গোল। ১৯৭৪ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলটি সেবার তিন ম্যাচে ১৪ গোল হজম করলেও কোনো গোল করতে পারেনি। তাই উইসার গোলটি তাদের জন্য ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেওয়ার মতো মুহূর্ত।

ম্যাচের প্রথমার্ধ শেষে বিবিসি ওয়ানের বিশ্লেষণে ফ্রান্সের সাবেক স্ট্রাইকার অলিভিয়ের জিরু মন্তব্য করেন, “গোল করার পর পর্তুগাল যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল।” মাঠের ঘটনাপ্রবাহও অনেকটা সেই কথারই প্রতিফলন। গোলের পর আক্রমণে ধার হারায় পর্তুগাল, মাঝমাঠেও দেখা যায় ছন্দপতন।

বিশেষ করে আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। কানসাসে লিওনেল মেসির ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলার রেকর্ড স্পর্শ করার এক দিনেরও কম সময়ের মধ্যে হিউস্টনে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ ম্যাচের মাধ্যমে ইতিহাসে নাম লেখান পর্তুগিজ মহাতারকা। একই সঙ্গে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সী আউটফিল্ড খেলোয়াড় হিসেবে শুরুর একাদশে নামার কীর্তিও গড়েন তিনি।

তবে ব্যক্তিগত এই অর্জনের দিনে মাঠের পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক। প্রথমার্ধে রোনালদোর বল স্পর্শ ছিল মাত্র ১৬ বার, যার মধ্যে প্রতিপক্ষের বক্সে ছিল একবার। পুরো ম্যাচে তিনি বল স্পর্শ করেছেন মাত্র ২৫ বার, যা অন্তত ৮০ মিনিট খেলা তার বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের ম্যাচগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।

পরিসংখ্যানও পর্তুগালের আক্রমণভাগের নিষ্প্রভতার কথা বলে। প্রথমার্ধে তারা মাত্র দুটি শট নিতে পেরেছিল, যার একটি ছিল লক্ষ্যে। অন্যদিকে ডিআর কঙ্গো নেয় ছয়টি শট, যার দুটি ছিল পোস্টমুখী।

বিরতির পর পর্তুগাল আক্রমণের গতি কিছুটা বাড়ানোর চেষ্টা করে। এ সময় রোনালদোকে সতীর্থ ভিতিনিয়ার সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করতেও দেখা যায়। অভিজ্ঞ এই ফরোয়ার্ড হয়তো দলকে ঘুরে দাঁড়ানোর বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যায়নি। দ্বিতীয়ার্ধে পর্তুগাল পাঁচটি শট নিলেও একটিও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি।

অন্যদিকে সমতার পর ডিআর কঙ্গো রক্ষণ আরও শক্ত করে। ফলে ম্যাচের শেষ দিকে কোনো দলই আর গোলের দেখা পায়নি।

ফলে ম্যাচ শেষে সবচেয়ে বড় হাসিটা ছিল ডিআর কঙ্গোর মুখে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম গোল, প্রথম পয়েন্ট এবং শক্তিশালী পর্তুগালের বিপক্ষে স্মরণীয় ড্র-সব মিলিয়ে হিউস্টনের রাতটি আফ্রিকার দলটির জন্য হয়ে থাকল এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। আর পর্তুগালের জন্য রয়ে গেল হারানো দুই পয়েন্ট এবং রোনালদোর নিষ্প্রভ পারফরম্যান্স নিয়ে নতুন প্রশ্ন।