বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র ‘ফেরদৌসী মজুমদার’ এর জন্মদিন ১৮ জুন। ১৯৪৩ সালের এই দিনে বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। অভিনয়জীবনের দীর্ঘ পথচলায় তিনি শুধু একজন শিল্পী হিসেবেই নয়, প্রেরণার উৎস হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার ব্যক্তিত্ব, শিল্পচর্চা এবং জীবনের প্রতি গভীর ভালোবাসা তাকে সমসাময়িকদের মধ্যে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
শিল্পীকে সাধারণত আমরা মঞ্চ, ক্যামেরা কিংবা চরিত্রের ভেতর দিয়ে দেখি। কিন্তু ফেরদৌসী মজুমদারকে কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায়, তার প্রকৃত শক্তি লুকিয়ে আছে তার জীবনদর্শনে। যিনি মঞ্চে হাজারো দর্শকের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন, বাস্তব জীবনে তিনি বরং নিরিবিলি ও আড়ালপ্রিয়। জন্মদিনের মতো বিশেষ দিনেও অতিরিক্ত মনোযোগ তাকে অস্বস্তিতে ফেলে।
সম্প্রতি একটি নাটকের শুটিংয়ে কয়েক দিন একসঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে অভিনেতা ও নির্মাতা আফজাল হোসেন নতুনভাবে আবিষ্কার করেন এই কিংবদন্তি শিল্পীকে। মহড়া, অভিনয়, গল্প আর নানা স্মৃতিচারণে কাটানো সেই সময় ছিল এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। বয়স ও শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে যে আত্মবিশ্বাস ও নিষ্ঠা নিয়ে ফেরদৌসী মজুমদার কাজ করেন, তা তরুণ প্রজন্মের শিল্পীদেরও বিস্মিত করে।
জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়েও তিনি কখনো শিল্পের প্রতি ভালোবাসা হারাননি। বরং সময়ের সঙ্গে সেই ভালোবাসা আরও গভীর হয়েছে। অভিনয় তার কাছে শুধু পেশা নয়, জীবনযাপনের একটি অংশ। তাই কাজের সমাপ্তি মানেই তার কাছে শিল্পযাত্রার শেষ নয়।
শিল্পের প্রতি তার নিবেদন নতুন প্রজন্মের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। তিনি দেখিয়েছেন, প্রতিভা যত বড়ই হোক, নিষ্ঠা ও অধ্যবসায় ছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের ভালোবাসা অর্জন করা সম্ভব নয়। তার উপস্থিতি মনে করিয়ে দেয়, সৃজনশীলতার প্রকৃত শক্তি বয়সে নয়, মানসিকতায়।
শিল্পী হিসেবে ফেরদৌসী মজুমদারের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো অসংখ্য নাটক, চরিত্র বা পুরস্কার নয়; বরং মানুষের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেওয়া। তিনি এমন একজন মানুষ, যার কাজ এবং জীবনবোধ প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে যাবে।
একটি নাটকের শুটিং শেষ হওয়ার পর পরিচালক যখন ‘প্যাকআপ’ ঘোষণা দেন, তখন সাধারণত শিল্পীদের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার আনন্দ দেখা যায়। কিন্তু সেদিন ফেরদৌসী মজুমদারের একটি মন্তব্য সবাইকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছিল। হাসিমুখে তিনি বলেছিলেন, “তোমার নাটকের প্যাকআপ হলো, আমাদের অভিনয়ের নয়।”
এই একটি বাক্যেই যেন ধরা পড়ে তার জীবনদর্শন। শিল্পের প্রতি ভালোবাসা, স্বপ্নের প্রতি বিশ্বাস এবং জীবনের প্রতি গভীর অনুরাগ সবকিছু মিলিয়ে তিনি আজও প্রমাণ করে চলেছেন, সত্যিকারের শিল্পীর অভিনয়ের কোনো প্যাকআপ হয় না।





