কুর্দি বংশোদ্ভূত বিশ্বকাপ মাতানো কে এই জার্মান ফরোয়ার্ড উন্দাভ?

বদলি হিসেবে নেমে দ্বিতীয়ার্ধে দুটি গোল করে ডেসিস উন্দাভ জার্মানিকে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে নাটকীয় জয় এনে দিয়েছেন। শনিবার রাতে এই জয়ের ফলে জার্মানি বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এ নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করে।

কোচ জুলিয়ান ন্যাগেলসম্যানের দল টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে কুরাসাওকে ৭-১ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল। তবে টরন্টো স্টেডিয়ামে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে তারা পিছিয়ে পড়ে, যখন ৩০ মিনিটে ফ্র্যান্ক কেসিই গোল করে আফ্রিকান দলকে এগিয়ে দেন।

আইভরি কোস্ট তাদের লিডের যথার্থ দাবিদার ছিল। কিন্তু বিরতির পর নাগেলসমানের কৌশলগত পরিবর্তন ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বদলি খেলোয়াড় নাদিয়েম আমিরি এবং উন্দাভের সমন্বয়ে ৬৮ মিনিটে সমতা ফেরে। এরপর যোগ করা সময়ে উন্দাভ আবারও গোল করে জার্মানির জয় নিশ্চিত করেন।

পরবর্তী রাউন্ডে ওঠার বিষয়টি উদযাপনের মতো কি না জানতে চাইলে নাগেলসমান বলেন, “আমাদের কাঙ্ক্ষা অনেক বড়। আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরবর্তী ধাপের দিকে মনোযোগ দেওয়া।”

২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেওয়ার পর জার্মানির জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।

টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা গোলদাতা

২৯ বছর বয়সী উন্দাভ এখন তিন গোল নিয়ে টুর্নামেন্টের যৌথ সর্বোচ্চ গোলদাতাদের একজন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তিনটি গোলই তিনি বদলি হিসেবে মাঠে নেমে করেছেন।

পরবর্তী ম্যাচে তিনি শুরুর একাদশে থাকবেন কি না জানতে চাইলে নাগেলসমান বলেন, “তাকে শুরু থেকেই খেলানো যেতে পারে। অবশ্যই প্রতিটি খেলোয়াড়ই প্রথম একাদশে থাকতে চায়। তবে আমার মনে হয় বর্তমান ভূমিকাতেও সে বেশ সন্তুষ্ট।”

ম্যাচসেরা পুরস্কার জয়ের পর উন্দাভ বলেন, “এটা দারুণ অনুভূতি। অসাধারণ একটা মুহূর্ত। এই পুরস্কার পাওয়া আমার জন্য বিশেষ ব্যাপার, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আমরা জিতেছি এবং পরের রাউন্ডে উঠেছি।”

কুর্দি ইয়াজিদি পরিবার থেকে বিশ্বকাপের মঞ্চে

উন্দাভ জার্মানির আচিম শহরে বেড়ে উঠেছেন, যা ব্রেমেনের কাছাকাছি। তবে তার বাবা-মা ছিলেন কুর্দি ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের সদস্য এবং তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তের কাছে অবস্থিত ইশিকলি গ্রামের বাসিন্দা।

তিনি প্রথম ইয়াজিদি বংশোদ্ভূত ফুটবলার, যিনি জার্মানির হয়ে কোনো বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করছেন।

প্রত্যাখ্যান থেকে সাফল্যের গল্প

১৪ বছর বয়সে ওয়েরদের ব্রেমেন তাকে জানিয়ে দেয় যে তার ভবিষ্যৎ নেই, কারণ সে শারীরিকভাবে খুব ছোট।

উন্দাভ পরে বলেন, “ওই সময় আমার হৃদয় ভেঙে গিয়েছিল। কিন্তু আমি আশা ছাড়িনি।”

১৭ বছর বয়সে তিনি পরিবারের বাড়ি ছেড়ে জার্মানির চতুর্থ বিভাগের ক্লাব হাভেলসেতে যোগ দেন। সেখানে তিনি ফুটবল খেলার পাশাপাশি একটি কারখানায় লেজার মেশিন অপারেটর হিসেবে পূর্ণকালীন কাজ করতেন।

তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, “ভোর চারটায় উঠতাম, কারখানায় যেতাম, তারপর অনুশীলন করতাম। রাত আটটার দিকে বাড়ি ফিরতাম। পরের দিন আবার একই রুটিন। শুধু ফুটবল থেকে পাওয়া অর্থে জীবন চালানো সম্ভব ছিল না।”

সেই সময় তিনি সপ্তাহে প্রায় ৬০০ দিরহাম সমপরিমাণ আয় করতেন।

বেলজিয়াম থেকে প্রিমিয়ার লিগ

২০২০ সালে উন্দাভ বেলজিয়ামের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব ইউনিয়ন সেইন্ট গিলোসেইয়ে যোগ দেন। তিনি ক্লাবটিকে শীর্ষ বিভাগে উন্নীত করতে সাহায্য করেন এবং পরে বেলজিয়ান প্রথম বিভাগে ২৫ গোল করেন।

এরপর তিনি ব্রাইটন ও হোভ আলবিওনে যোগ দেন। তবে প্রিমিয়ার লিগে ২২ ম্যাচে মাত্র পাঁচ গোল করার পর তাকে ধারে পাঠানো হয় ভিএফবি স্টোটগার্টে।

স্টুটগার্টে তিনি নিজের সেরাটা ফিরে পান। ২০২৪ সালে ক্লাবটি তাকে স্থায়ীভাবে দলে ভিড়ায়।

বিশ্বকাপ দলে জায়গা পাওয়ার পথ

২০২৫-২৬ মৌসুমে উন্দাভ লিগে ১৯ গোল করেন। তার এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্স স্টুটগার্টকে চ্যাম্পিয়ন লিগে খেলার সুযোগ এনে দেয় এবং একই সঙ্গে তাকে জার্মানির বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা করে দেয়।

আজ বিশ্বকাপের মঞ্চে তার জোড়া গোল প্রমাণ করছে, কারখানার শ্রমিক থেকে আন্তর্জাতিক তারকায় পরিণত হওয়ার এই দীর্ঘ যাত্রা মোটেও কাকতালীয় ছিল না।

সূত্র: নিউজ নাউ