২৪ বছরের অভিশাপ ভাঙল ব্রাজিল, শেষ সেকেন্ডের গোলে স্তব্ধ জাপান

হিউস্টন স্টেডিয়ামে তখন ঘড়ির কাঁটায় ৯০+৬ মিনিট। ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির এক অবিশ্বাস্য জাদুকরী শট, আর তাতেই যেন পুরো স্টেডিয়ামে আছড়ে পড়ল এক টুকরো ব্রাজিল।

জাপানের বুক ভেঙে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল বা শেষ ১৬ নিশ্চিত করল পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। আর এই জয়ের সাথে সাথেই ব্রাজিল ভেঙে চুরমার করল দীর্ঘ ২৪ বছরের এক অভিশপ্ত খরা।

২০০২ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়েও খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে এমন অবিশ্বাস্য জয় ছিনিয়ে আনল সেলেসাওরা।

ম্যাচ শেষে একদিকে যখন ভিনিসিয়ুস-মার্তিনেল্লির বুনো উল্লাস, অন্যদিকে তখন পুরো স্টেডিয়ামের সামনে মাথা নত করে ক্ষমা চাচ্ছেন জাপানি কোচ। কী ঘটেছিল হিউস্টনের সেই রুদ্ধশ্বাস রাতে?

ম্যাচের প্রথমার্ধে ‘সামুরাই ব্লু’ খ্যাত জাপান যে ফুটবল খেলল, তা এককথায় দুর্দান্ত। ব্রাজিলের চেনা সাম্বা ছন্দকে বোকা বানিয়ে ম্যাচের ২৯ মিনিটে কাইশু সানোর চমৎকার গোলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় এশিয়ার পরাশক্তিরা। প্রথমার্ধে জাপানের নিরেট রক্ষণাত্মক কৌশলের সামনে গোলমুখ খুলতে রীতিমতো সংগ্রাম করতে হয় ভিনিসিয়ুসদের।

তবে বিরতির পর দৃশ্যপটে হাজির কোচ কার্লো আনচেলত্তির সেই বিখ্যাত ‘ক্ষুরধার মস্তিষ্ক’। দ্বিতীয়ার্ধে তাঁর চতুর কৌশলগত পরিবর্তন ম্যাচের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেয়।

৫৬ মিনিটে অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার কাসেমিরোর এক দুর্দান্ত সমতাসূচক গোলে ম্যাচে সমতায় ফেরে ব্রাজিল। সাবেক ইংলিশ ফরোয়ার্ড ক্রিস সাটন এই জয়কে ঠিকই বলেছেন ‘এটি পুরোপুরি আনচেলত্তির মগজের ফসল’।

সমতায় ফেরার পর ম্যাচটি উন্মুক্ত হয়ে যায়। ফর্মের তুঙ্গে থাকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ৫৮ মিনিটে বামপ্রান্ত থেকে বল নিয়ে দারুণ গতিতে জাপানি ডিফেন্ডার তোমিয়াসুকে নাটমেগ করে বক্সে ঢোকেন, গোলকিপারকে ফাঁকি দিয়ে শটও নেন, কিন্তু দুর্ভা। বলটি পোস্টে লেগে ফিরে আসে। গোল না পেলেও ম্যাচ শেষে ভিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, আমরা টিকে আছি এবং আরও বেশি চাই। এটা ব্রাজিলের জন্য।

আর ঠিক যখন ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়াচ্ছিল, তখনই আসে সেই ৯০+৬ মিনিটের ঐতিহাসিক মুহূর্ত। গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলির পায়ে বল আর চোখের পলকে তা জাপানের জালে।

ম্যাচ শেষে মার্তিনেল্লি আবেগ ধরে রাখতে না পেরে বলেন, আমার হৃদয়ের আনন্দ প্রকাশ করার মতো ভাষা আমি খুঁজে পাচ্ছি না। বল পোস্টে লাগার পর আমি জানতাম আমি আরেকটি সুযোগ পাব।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০০২ বিশ্বকাপে তুরস্কের বিপক্ষে ম্যাচের পর বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে এই প্রথম প্রথমার্ধে পিছিয়ে থেকেও ম্যাচ জিতল ব্রাজিল। পুরো ম্যাচে গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস একাই করেছেন রেকর্ড ১৩৫টি পাস।

অন্যদিকে, এই ম্যাচ উপহার দিল বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম এক আবেগঘন ও মর্যাদাপূর্ণ দৃশ্য। ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার পর জাপানের কোচ হাজিমে মরিয়াসু মাঠের মাঝেই সব খেলোয়াড়দের একত্র করেন। এরপর কোটি কোটি দর্শকের সামনে ক্যামেরার দিকে মাথা নত করে জাপানের জনগণের কাছে ক্ষমা চান।

টানা আট বছর ধরে জাপানের দায়িত্বে থাকা এই কোচ বলেন, আমি গভীরভাবে দুঃখিত যে আমরা সবাইকে এই জয় উপহার দিতে পারিনি। একজন কোচ হিসেবে আমি মনে করি এর দায়িত্ব আমার এবং আমি সবার কাছে ক্ষমা চাই।

তবে আমার খেলোয়াড়রা তাদের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছে। হারের পরও কোচের এমন নিবেদন দেখে জাপানি খেলোয়াড় এবং সমর্থকরা করতালির মাধ্যমে তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান জানান।