ফুটবল বিশ্বকাপ দেখল ইতিহাসের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য এক অঘটন। ফুটবল দুনিয়ায় একটি কথা প্রচলিত আছে ‘জার্মানরা কখনো টাইব্রেকারে হারে না।’ কিন্তু বিশ্বকাপের সবচেয়ে নির্মম মঞ্চে জার্মানির সেই অপরাজেয় দুর্গ একাই ভেঙে চুরমার করে দিল দক্ষিণ আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়ে।
৪-৩ ব্যবধানে টাইব্রেকারে জার্মানিকে হারিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ৪১ নম্বরে থাকা প্যারাগুয়ে। আর এই হারের মাধ্যমে বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম স্পটকিকের লড়াইয়ে পরাজয়ের স্বাদ পেল চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি। একই সাথে চুকে গেল দীর্ঘ ২৪ বছরের পুরোনো এক হিসাব। কী ঘটেছিল বোস্টনের সেই ঐতিহাসিক রাতে?
আমেরিকার ফক্সবরোর বোস্টন স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখলে আধিপত্য বিস্তার করে খেলছিল জার্মানি। কিন্তু ম্যাচের ৪২ মিনিটে সবাইকে চমকে দিয়ে মাতিয়াস গালারজার নিখুঁত ক্রস থেকে এক বুলেট হেডে গোল করে প্যারাগুয়েকে এগিয়ে দেন হুলিও এনসিসো।
১-০ তে পিছিয়ে থেকে বিরতিতে যাওয়া জার্মানি দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই আক্রমণের ধার বাড়ায়। ফলস্বরূপ ৫৪ মিনিটে ফ্লোরিয়ান ভির্টৎসের চমৎকার ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে জার্মানিকে সমতায় ফেরান কাই হাভার্টজ।
নির্ধারিত ৯০ মিনিটে আর গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। আর সেখানেই আসে ম্যাচের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত। ১০২ মিনিটে কর্নার থেকে উড়ে আসা বলে জোনাথান তাহ হেড করে বল জালে পাঠালে বুনো উল্লাসে মেতে ওঠে জার্মান শিবির।
কিন্তু সেই আনন্দ স্থায়ী হয়েছিল মাত্র কয়েক সেকেন্ড। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর-এ দেখা যায়, গোলের ঠিক আগমুহূর্তে প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিলকে ধাক্কা দিয়েছিলেন জার্মান ডিফেন্ডার ভালডেমার অ্যান্টন। ফলে ফাউলের অপরাধে গোলটি বাতিল করেন রেফারি।
১২০ মিনিটের স্নায়ুচাপের লড়াই শেষে ম্যাচ গড়ায় ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ভাগ্যনির্ধারক মঞ্চ টাইব্রেকারে। যে জার্মানি বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে এর আগের ৭টি টাইব্রেকারের ৬টিতেই জিতেছিল, সেই জার্মানিই এবার স্পটকিকে খেই হারিয়ে ফেলে।
টাইব্রেকারের শুরুতেই জার্মানির সেরা তারকা কাই হাভার্টজের শট বাজপাখির মতো ডাইভ দিয়ে ঠেকিয়ে দেন প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিল। এরপর জার্মানির আরও দুটি শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে পুরো ম্যাচ চলে যায় প্যারাগুয়ের নিয়ন্ত্রণে। গোলপোস্টের নিচে অরল্যান্ডো গিল এদিন হয়ে উঠেছিলেন এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর।
শেষ পর্যন্ত সাডেন ডেথে প্যারাগুয়ের হোসে কানালের ষষ্ঠ শটটি জার্মানির জালে জড়াতেই স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো জার্মান শিবির, আর বিস্ফোরিত হয় প্যারাগুয়ের ঐতিহাসিক উল্লাস। ৪-৩ ব্যবধানে টাইব্রেকার জিতে ইতিহাস গড়ে শেষ ১৬-তে পা রাখে প্যারাগুয়ে।
প্যারাগুয়ের জন্য এই জয়টি শুধু শেষ ১৬-তে ওঠার আনন্দ নয়, এটি ছিল দীর্ঘ ২৪ বছরের পুরোনো এক ক্ষতে প্রলেপ দেওয়ার রাত। ২০০২ সালে কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপের ঠিক এই রাউন্ড অব সিক্সটিনের লড়াইয়ে জার্মানির কাছে ১-০ গোলে হেরে চোখের জলে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল প্যারাগুয়েকে।
দীর্ঘ এক চতুর্থাংশ শতাব্দী পর, ঠিক একই মঞ্চে সেই জার্মানিকে টুর্নামেন্ট থেকে বের করে দিয়ে মধুরতম প্রতিশোধের এক অবিশ্বাস্য গল্প লিখল তারা। র্যাঙ্কিংয়ের ১০ নম্বর দলকে বিদায় করে ৪১ নম্বরের প্যারাগুয়ে প্রমাণ করে দিল ফুটবলকে কেন ‘অনিশ্চয়তার খেলা’ বলা হয়।





