আদ্-দ্বীনের লাইসেন্স বাতিলে অনিশ্চয়তায় ২০৯ বিদেশি শিক্ষার্থী, দুশ্চিন্তায় চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের ঘটনায় চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন ভারত, নেপাল ও মালদ্বীপ থেকে আসা ২০৯ জন বিদেশি শিক্ষার্থী। বিশেষ করে ভারতের ন্যাশনাল মেডিকেল কমিশনের (এনএমসি) কঠোর নীতিমালার কারণে ভর্তি হওয়ার পর অন্য কোনো মেডিকেল কলেজে স্থানান্তরের সুযোগ না থাকায় তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে দুই বছর আগে রাজধানীর আদ্-দ্বীন উইমেনস মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন ভারতের কাশ্মীরের শিক্ষার্থী তাবিন্দা। এ পর্যন্ত তার পড়াশোনার পেছনে পরিবার ব্যয় করেছে প্রায় ৩২ লাখ টাকা। কিন্তু হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল হওয়ার পর সেই স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার মুখে।

দেশের একটি গণমাধ্যমকে তাবিন্দা বলেন, ‘লাইসেন্স বাতিলের খবর আমাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছে। অনেক রাত পর্যন্ত ঘুমাতে পারি না। পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এখানে এসেছিলাম। এখন সেই স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটছে।’

ভারতের এনএমসির বিধিমালা অনুযায়ী, যে মেডিকেল কলেজে একজন শিক্ষার্থী এমবিবিএস শুরু করবেন, সেখানেই তাকে পড়াশোনা ও ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করতে হবে। ফলে আদ্-দ্বীনের লাইসেন্স পুনর্বহাল না হলে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি, সময় এবং বিপুল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

বর্তমানে আদ্-দ্বীন উইমেনস মেডিকেল কলেজে মোট ৪৩৭ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। এর মধ্যে ২০৯ জন বিদেশি। তাদের মধ্যে ২০৭ জন ভারতের, একজন নেপালের এবং একজন মালদ্বীপের নাগরিক। ভারতীয় শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগই কাশ্মীরের বাসিন্দা।

ভারতের আসাম ও কাশ্মীর থেকে আসা শিক্ষার্থীরা জানান, বাংলাদেশে এমবিবিএস সম্পন্ন করতে তাদের ৫২ থেকে ৫৪ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। এমন পরিস্থিতিতে কলেজটির লাইসেন্স পুনর্বহাল না হলে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, বছরের পর বছর পরিশ্রম এবং চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নও হুমকির মুখে পড়বে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ড্যাবের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ডা. মোসাদ্দেক হোসেন বিশ্বাস ডাম্বেল।

তিনি বলেন, এ ঘটনার নেতিবাচক প্রভাব আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছালে ভবিষ্যতে বিদেশি শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে চিকিৎসাশাস্ত্র পড়তে আগ্রহ হারাতে পারেন। অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাসেবা এবং শত শত শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রমের স্বার্থ বিবেচনায় হাসপাতালটি দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

জনস্বাস্থ্যবিদরাও মনে করছেন, রাজধানীতে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সংকটের মধ্যে এমন একটি হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যাওয়া জনস্বাস্থ্যের জন্যও উদ্বেগের বিষয়। তাই অনিয়মের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংকট উত্তরণে কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, এ ঘটনার পর সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলো আরও সতর্ক হয়েছে। অনিয়মের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তবে শাস্তির উদ্দেশ্য শুধু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হওয়া উচিত নয়। রোগী, শিক্ষার্থী এবং জনস্বার্থ বিবেচনায় সংশোধনের সুযোগ রেখে কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে, লাইসেন্স পুনর্বহালের জন্য ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দ্রুত এ সংকটের সমাধান না হলে বাংলাদেশে বিদেশি শিক্ষার্থীদের আস্থা কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের চিকিৎসাশিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।