সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে নতুন পে-স্কেল বা বেতন কাঠামো নিয়ে নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত জানিয়েছে সরকার। দেশের বর্তমান সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করে এবার একবারে পুরো বেতন কাঠামো কার্যকর না করে, তা ধাপে ধাপে বা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনার প্রথম ধাপে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কেবল ‘মূল বেতন’ বা বেসিক বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, চলতি জুলাই মাসের মাঝামাঝি কিংবা শেষ সপ্তাহের দিকেই এই সংক্রান্ত চূড়ান্ত গেজেট আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ হতে পারে। এরই মধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর প্রস্তাবিত ২০টি গ্রেডের মূল বেতনের একটি প্রাথমিক রূপরেখা ও তালিকা সামনে এসেছে, যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোতে চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই চলছে।
এদিকে নতুন পে-স্কেলের একটি প্রস্তাবিত রূপরেখা নিয়ে এরই মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত নবম জাতীয় পে-স্কেলে আগের মতো ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হয়েছে। এই কাঠামোতে প্রথম বা সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতন ধরা হয়েছে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা। এরপর দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম গ্রেড পর্যন্ত মূল বেতন প্রস্তাব করা হয়েছে যথাক্রমে এক লাখ ৩২ হাজার, এক লাখ ১৩ হাজার, এক লাখ এবং ৮৬ হাজার টাকা।
অন্যদিকে, প্রস্তাবনায় ষষ্ঠ থেকে দশম গ্রেডের মূল বেতনের কাঠামো যথাক্রমে ৭১ হাজার, ৫৮ হাজার, ৪৭ হাজার ২০০, ৪৫ হাজার ১০০ এবং ৩২ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। একইভাবে ১১তম থেকে ১৫তম গ্রেড পর্যন্ত যথাক্রমে ২৫ হাজার, ২৪ হাজার ৩০০, ২৪ হাজার, ২৩ হাজার ৫০০ এবং ২২ হাজার ৮০০ টাকা মূল বেতন প্রস্তাব করা হয়েছে।
এতে নিচের সারির গ্রেডগুলোর মধ্যে ১৬তম গ্রেডে ২১ হাজার ৯০০, ১৭তম গ্রেডে ২১ হাজার ৪০০, ১৮তম গ্রেডে ২১ হাজার, ১৯তম গ্রেডে ২০ হাজার ৫০০ এবং সর্বনিম্ন বা ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে খসড়া প্রস্তাবে। সংশ্লিষ্টরা প্রত্যাশা করছেন, জুলাই মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে গেজেট প্রকাশের মধ্য দিয়েই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই পে-স্কেল বাস্তবায়নের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হবে।
ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পথে সরকার
অর্থনৈতিক চাপের মুখে একসঙ্গে সম্পূর্ণ পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হলে তা মুদ্রাস্ফীতি ও বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই সরকার এই কৌশলী পথ বেছে নিয়েছে। প্রথম দফায় শুধু মূল বেতন বাড়ানো হলে চাকরিজীবীরা তাৎক্ষণিক বড় একটি সুবিধা পাবেন, যা তাদের জীবনযাত্রার মান ধরে রাখতে সাহায্য করবে। পরবর্তী ধাপগুলোতে অন্যান্য ভাতা ও আনুষঙ্গিক সুবিধা যুক্ত করা হতে পারে।
বিবিসি বাংলাকে যা জানালেন অর্থ উপদেষ্টা
সম্প্রতি সংবাদমাধ্যম ‘বিবিসি বাংলা’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ধরন ও সরকারি পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তিনি জানান, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নির্দেশনার আলোকেই এই নতুন বেতন কাঠামোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হচ্ছে। সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যালোচনা করেই একসঙ্গে সব সুবিধা কার্যকর না করে প্রথম দফায় শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন (বেসিক) বাড়ানোর এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে কোন গ্রেডে ঠিক কত টাকা বা কত শতাংশ হারে বেতন বৃদ্ধি পাচ্ছে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের আগে সুনির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি এই অর্থ উপদেষ্টা। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও উপ-কমিটিগুলো গেজেটটি নিখুঁত ও চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা ও কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
গেজেটের অপেক্ষায় ২০ গ্রেডের লাখো কর্মচারী
নতুন পে-স্কেলের এই রূপরেখা সামনে আসার পর থেকেই সরকারি বিভিন্ন দফতর, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ ও উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। ২০টি গ্রেডের নতুন মূল বেতনের হার কেমন হবে এবং তা বর্তমান বাজারদরের সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তা জানতে এখন সবাই চলতি মাসের মাঝামাঝিতে প্রকাশ পেতে যাওয়া চূড়ান্ত গেজেটের দিকে তাকিয়ে আছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চলতি জুলাই মাসের শেষ নাগাদ গেজেট প্রকাশিত হলে নতুন এই বেতন কাঠামো চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই কার্যকর হিসেবে গণ্য হতে পারে।





