যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে ইরানে বিমান হামলা এবং ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞায় দেওয়া সাময়িক ছাড় প্রত্যাহারের পর আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও বেড়েছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
আজ বুধবার (৮ জুলাই) আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক পর্যায়ে প্রায় ৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এতে যুদ্ধ শুরুর আগে যে পর্যায়ে তেলের দাম নেমে এসেছিল, সেই নিম্নমুখী প্রবণতা উল্টে যায়।
বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টা পর্যন্ত সেপ্টেম্বর ডেলিভারির ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দাঁড়ায় ব্যারেলপ্রতি ৭৬ দশমিক ০৭ ডলার, যা গত ২৩ জুনের পর সর্বোচ্চ। খবর আল জাজিরার।
তেলের দামের এই উল্লম্ফনের পেছনে রয়েছে হরমুজ প্রণালিতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা। ওই হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও সৌদি আরব ইরানকে দায়ী করেছে।
এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যাপক সামরিক হামলা চালায়। একই সঙ্গে ইরানি তেল রপ্তানির ওপর দেওয়া সাময়িক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের অনুমতিও বাতিল করে ওয়াশিংটন।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক নৌপথে বেসামরিক জাহাজে হামলার জবাব দিতেই ইরানের বিরুদ্ধে এই সামরিক অভিযান শুরু হয়েছে।
ইরান সরাসরি ট্যাংকারে হামলার দায় স্বীকার না করলেও দেশটির কর্মকর্তারা আগেই সতর্ক করেছিলেন, তেহরানের অনুমোদন ছাড়া কোনো জাহাজ নির্ধারিত রুট ব্যবহার করলে তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেছেন, তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের অনুমতি বাতিল করা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) ‘স্পষ্ট লঙ্ঘন’।
কাজেম গারিবাবাদি বলেন, জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষায় ইরান প্রয়োজনীয় ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
অস্ট্রেলিয়ার আইজি গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক টনি সাইকামোর বলেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মূল বিরোধ কখনোই পুরোপুরি মীমাংসা হয়নি।
তার মতে, সমঝোতা স্মারকে প্রণালির প্রশাসন ও জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভাষা ছিল অস্পষ্ট।
টনি সাইকামোর বলেন, মার্কিন হামলার পর উত্তেজনা দ্রুত কমবে নাকি ইরান হরমুজ প্রণালিকে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার অব্যাহত রাখবে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
তার ভাষায়, অন্তত আপাতত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকবে এবং তেলের দাম উচ্চ অবস্থানেই থাকতে পারে।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) রাতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানি তেল রপ্তানির ওপর দেওয়া ৬০ দিনের বিশেষ ছাড় বাতিলের ঘোষণা দেয়।
এর আগে গত মাসে আলোচনার অংশ হিসেবে ইরানকে ২১ আগস্ট পর্যন্ত সীমিত আকারে তেল বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৭ জুলাই থেকে ইরানি তেল কেনা, লোডিং কিংবা নতুন কোনো বাণিজ্যিক লেনদেন আর বৈধ থাকবে না।
এমএসটি মারকুইয়ের জ্বালানি গবেষণা প্রধান সাউল কাভোনিক মনে করেন, আগামী কয়েক সপ্তাহে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরান আরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবে।
সাউল কাভোনিক বলেন, ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করতে চায়, যা যুক্তরাষ্ট্র, উপসাগরীয় দেশ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি ক্রেতাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
তার মতে, এর ফলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল দীর্ঘ সময় যুদ্ধ-পূর্ব স্বাভাবিক অবস্থার অর্ধেকেরও কম পর্যায়ে থাকতে পারে এবং মাঝেমধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনাও দেখা দিতে পারে।
বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।





