সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো চালুর বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি সরকারের ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। রাজস্ব আয় বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বাজেট ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার পরই নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত বলে মনে করছে আইএমএফ।
বাংলাদেশের অর্থনীতি সাম্প্রতিক অস্থিরতা কাটিয়ে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার দিকে যাচ্ছে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি। তবে এই অগ্রগতি ধরে রাখতে হলে শুধু রিজার্ভ, রফতানি বা প্রবাসী আয়ের মতো সূচকের উন্নতি যথেষ্ট নয়। ব্যাংক খাতের সংস্কার, ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে জানিয়েছে তারা।
বাংলাদেশের জন্য ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল সোমবার (১৩ জুলাই) অর্থ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছে। এসব আলোচনায় দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, আর্থিক খাতের সংস্কার, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং চলমান সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, দেশের বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় নিয়েই সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে। তিনি বলেন, সব পরিবর্তন একসঙ্গে করা সম্ভব নয়; কোন পদক্ষেপ আগে নেওয়া হবে এবং কোনটি পরে— তা অগ্রাধিকার অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে।
পে স্কেল বাস্তবায়নে কেন সতর্ক আইএমএফ
নতুন পে স্কেল নিয়ে সরকারের প্রস্তুতির বিষয়ে আইএমএফ মনে করছে, বর্তমান সময়ে বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সরকারি রাজস্ব আয় এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। পাশাপাশি বাজেট ঘাটতির চাপও রয়েছে। এ অবস্থায় বেতন-ভাতা বাড়লে সরকারি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
আইএমএফের আশঙ্কা, নতুন বেতন কাঠামোর ফলে মানুষের হাতে অতিরিক্ত অর্থ আসলে ভোগব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব মূল্যস্ফীতির ওপর পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই আগে অর্থনীতির মৌলিক সক্ষমতা বাড়ানোর পর পে স্কেল বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
অর্থনীতিতে কিছু স্বস্তির লক্ষণ
আইএমএফের মূল্যায়নে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে, ডলারের বাজারে চাপ কমেছে, রফতানি ও প্রবাসী আয় ভালো ধারায় রয়েছে এবং মূল্যস্ফীতিও ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণের দিকে যাচ্ছে।
তবে সংস্থাটি মনে করছে, এসব উন্নতি এখনও পুরোপুরি কাঠামোগত পরিবর্তনের ফল নয়। দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য আর্থিক খাতের দুর্বলতা দূর করা জরুরি।
ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের তাগিদ
ভর্তুকি ব্যবস্থাপনাকে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে আইএমএফ। সংস্থাটির মতে, কয়েকটি খাতে ভর্তুকি কমানোর পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তব অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় কম।
বিশেষ করে বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া ভর্তুকির চাপ কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে তারা। ভর্তুকি সংস্কারে ধীরগতির কারণে সরকারের ব্যয় বাড়ছে এবং বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে আইএমএফ।
অর্থমন্ত্রী অবশ্য জানিয়েছেন, ভর্তুকি নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। নতুন ঋণ কর্মসূচির কাঠামো নিয়ে আলোচনা চলছে।
ব্যাংক খাত নিয়ে সর্বোচ্চ উদ্বেগ
বাংলাদেশের আর্থিক খাতের মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হিসেবে দেখছে আইএমএফ।
সংস্থাটির মতে, খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, মূলধন ঘাটতি এবং অনিয়ম ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
আইএমএফের পরামর্শ হলো— খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিস্থিতি প্রকাশ করতে হবে, দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে এবং ব্যাংক পরিচালনায় জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
এ ছাড়া দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক যে বিশেষ তারল্য সহায়তা দিয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্যও চেয়েছে সংস্থাটি। সহায়তার পরিমাণ, শর্ত, শর্ত পালনের অবস্থা এবং অর্থ ফেরতের পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকের তারল্য সংকটের কারণ এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপ নিয়েও তথ্য চেয়েছে আইএমএফ।
রাজস্ব সংস্কারে গতি বাড়ানোর তাগিদ
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে সুপারিশ করে আসছে আইএমএফ। রাজস্ব নীতি নির্ধারণ ও কর আদায়ের কার্যক্রম আলাদা কাঠামোয় আনার প্রস্তাব বাস্তবায়নে ধীরগতিতে উদ্বেগ জানিয়েছে সংস্থাটি।
আইএমএফ মনে করছে, প্রযুক্তিনির্ভর কর ব্যবস্থাপনা, করজাল সম্প্রসারণ এবং প্রশাসনিক সংস্কার ছাড়া সরকারের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো কঠিন।
এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন বাজেটে করহার না বাড়িয়ে নতুন করদাতা যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে করজাল বিস্তারের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
সংসদের নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ
অর্থনৈতিক সংস্কারে জাতীয় সংসদের কার্যকর ভূমিকার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফ। আর্থিক খাত, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং রাজস্ব প্রশাসনে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংসদীয় কমিটির কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
নতুন ঋণ কর্মসূচি কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশ বর্তমানে বৈদেশিক ঋণের অর্থ পরিশোধের চাপের মধ্যে রয়েছে। এ অবস্থায় ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের সম্ভাব্য নতুন আইএমএফ ঋণ কর্মসূচি অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ঋণের অর্থ নয়, আইএমএফের আস্থা বাংলাদেশের জন্য বড় বিষয়। কারণ আন্তর্জাতিক এই সংস্থার ইতিবাচক মূল্যায়ন অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী ও বিনিয়োগকারীদের কাছেও আস্থার বার্তা দেয়।
সব মিলিয়ে আইএমএফের মূল্যায়ন হলো— বাংলাদেশের অর্থনীতি সংকট কাটিয়ে স্থিতিশীলতার পথে এগোচ্ছে। তবে এই অগ্রগতি ধরে রাখতে হলে ব্যাংক খাতের সংস্কার, রাজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি, ভর্তুকির যৌক্তিক ব্যবহার এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে হবে।





