ইসলামের দৃষ্টিতে তালাক বৈধ হলেও কাঙ্ক্ষিত নয়

বিবাহ ইসলামের দৃষ্টিতে শুধুমাত্র একটি সামাজিক চুক্তি নয়, এটি ভালোবাসা; দয়া, পারস্পরিক সম্মান ও দায়িত্ববোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি পবিত্র বন্ধন। একটি সুস্থ পরিবারই সুস্থ সমাজের ভিত্তি। তাই ইসলাম যেমন বিবাহকে সহজ করেছে, তেমনি সংসার রক্ষা ও পারিবারিক শান্তি বজায় রাখার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। বৈবাহিক জীবনে যখন সব ধরনের সমঝোতার পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখনই শুধু তালাককে শেষ ও অনিবার্য সমাধান হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে।

ইসলামি শরিয়ত স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে ভালোবাসা, মমতা ও দয়ার ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছে। পরিবারকে স্থিতিশীল রাখা এবং প্রত্যেক সদস্যের অধিকার সংরক্ষণ করাই ইসলামের অন্যতম উদ্দেশ্য। তাই বিবাহিত জীবনে মতবিরোধ দেখা দিলেও ধৈর্য, সহনশীলতা, ক্ষমাশীলতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো। যদি তোমরা তাদের অপছন্দ করো, তবে হতে পারে তোমরা এমন একটি বিষয় অপছন্দ করছ, যাতে আল্লাহ অনেক কল্যাণ রেখেছেন।’ -সূরা আন নিসা: ১৯

কেননা কখনো কখনো মানুষের দৃষ্টিতে যে বিষয়টি অপছন্দনীয় মনে হয়, আল্লাহতায়ালা তাতেই বহু কল্যাণ ও বরকত রেখে দেন। তাই সাময়িক রাগ, অভিমান বা মতবিরোধের কারণে সংসার ভেঙে দেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়। নবী কারিম (সা.)-ও স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সহনশীলতার শিক্ষা দিয়েছেন। হাদিসে বলা হয়েছে, ‘কোনো মুমিন পুরুষ যেন কোনো মুমিন নারীকে ঘৃণা না করে। যদি তার কোনো একটি স্বভাব অপছন্দ হয়, তবে নিশ্চয়ই তার অন্য কোনো স্বভাব তাকে সন্তুষ্ট করবে।’ -সহিহ মুসলিম

এই হাদিস আমাদের শেখায়- মানুষের দুর্বলতার দিকে নয়, তার ভালো গুণগুলোর দিকে নজর দিতে হবে। দোষ খুঁজে সম্পর্ক ভাঙার পরিবর্তে গুণাবলিকে মূল্যায়ন করে ধৈর্যের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করার চেষ্টা করাই একজন মুমিনের পরিচয়।

ইসলামের দৃষ্টিতে তালাক কোনো আবেগের সিদ্ধান্ত নয়। বরং যখন সব ধরনের মীমাংসার চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং একসঙ্গে বসবাস করা সত্যিই অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন ক্ষতি দূর করার উদ্দেশ্যে তালাকের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এটি কখনোই তাড়াহুড়ো করে বিবাহবিচ্ছেদের অজুহাত হতে পারে না।

তাইতো ইসলাম তালাকের শরয়ি পদ্ধতি বলে দিয়েছে। স্বামী স্ত্রীকে এমন পবিত্রতার সময়ে একবার তালাক দেবেন, যখন সেই পবিত্রতার সময়ে তাদের মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি। অথবা স্ত্রী যদি গর্ভবতী হন, তবে সেই অবস্থায় তালাক দেওয়া যেতে পারে। এরপর স্ত্রীকে ইদ্দতের সময় দাম্পত্য গৃহেই থাকার সুযোগ দিতে হবে, যাতে পুনর্মিলনের সম্ভাবনা বজায় থাকে। কারণ আল্লাহ চাইলে এ সময়ের মধ্যেই উভয়ের মন পরিবর্তন হতে পারে এবং পরিবার আবারও একত্রিত হতে পারে।

ইসলাম মানুষকে বিশেষভাবে সতর্ক করেছে শরিয়তবিরোধী তালাক ও প্রচলিত কিছু ভুল পদ্ধতি সম্পর্কে। যেমন- এক বৈঠকে তিন তালাক উচ্চারণ করা, ঋতুস্রাব চলাকালে তালাক দেওয়া অথবা এমন পবিত্রতার সময় তালাক দেওয়া, যখন ওই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সহবাস হয়েছে। এসব পদ্ধতি শরিয়তের নির্দেশনার পরিপন্থী।

অনেকেই কথার জোর বাড়াতে বা কাউকে বাধ্য করতে ‘তালাকের কসম’ ব্যবহার করেন। যেমন- ‘তালাকের কসম, তুমি আজ এখানেই খাবে’, ‘তালাকের কসম, তুমি ওখানে যাবে না’ ইত্যাদি। এগুলোও অত্যন্ত নিন্দনীয় অভ্যাস। তালাক আল্লাহর নির্ধারিত একটি গুরুতর বিধান; এটিকে খেলাচ্ছলে, শপথ হিসেবে বা কথার জোর বাড়ানোর উপায় হিসেবে ব্যবহার করা মারাত্মক অবহেলার পরিচয়। এ প্রসঙ্গে তিনি আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। অতএব তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। আর যারা আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করে, তারাই জালেম।’ -সূরা আল বাকারা: ২২৯

ইসলামি স্কলাররা স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই ধৈর্যশীল, বিচক্ষণ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী হওয়ার আহ্বান জানায়। ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়, রাগের মুহূর্তে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়, যার জন্য পরে সারাজীবন অনুশোচনা করতে হয়। এ জন্য নারীদেরও গুরুত্বপূর্ণ একটি শরয়ি নির্দেশনা স্মরণ রাখা দরকার। কোনো বৈধ কারণ ছাড়া শুধু আবেগ বা সাময়িক অসন্তুষ্টির বশবর্তী হয়ে স্বামীর কাছে তালাক চাওয়া ইসলামে বৈধ নয়। এ প্রসঙ্গে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘যে নারী কোনো বৈধ কারণ ছাড়া তার স্বামীর কাছে তালাক চায়, তার জন্য জান্নাতের সুঘ্রাণও হারাম হয়ে যায়।’ -জামে তিরমিজি

ইসলামের দৃষ্টিতে তালাক বৈধ হলেও এটি কখনোই কাঙ্ক্ষিত নয়। ইসলামের লক্ষ্য সংসার ভাঙা নয়, বরং সংসার টিকিয়ে রাখা। তাই স্বামী-স্ত্রীর উচিত পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা ও আন্তরিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। কারণ একটি স্থিতিশীল পরিবার শুধু দু’জন মানুষের সুখই নিশ্চিত করে না; বরং সন্তান, সমাজ এবং পুরো জাতির কল্যাণের ভিত্তিও রচনা করে। আর যখন বিচ্ছেদ ছাড়া সত্যিই কোনো পথ অবশিষ্ট থাকে না, তখনও ইসলামের নির্ধারিত বিধান ও শিষ্টাচার মেনেই সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা একজন মুমিনের কর্তব্য।