আন্দোলনের ঝড় কলকাতায়, আলোচনার ডাকেও অনড় ককরোচ পার্টি

ভারতের মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষা (নিট) প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদের আঁচ এসে পড়েছে কলকাতায়। দিল্লির আন্দোলনের সমর্থনে বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) কলকাতার পার্ক সার্কাসের আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তবে তাদের কর্মসূচি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ‘মহা মিছিল ও সংহতি সভা’ শিরোনামে একটি বড় ব্যানার সামনে রেখে কিছুক্ষণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন তারা।

ব্যানারে লেখা ছিল, ‘শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগের দাবি এবং দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদ ও ছাত্রদের প্রতি সংহতি জানিয়ে মহামিছিল।’

ব্যানারের নিচের অংশে লেখা ছিল, ‘সাধারণ ছাত্র-ছাত্রী, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়।’ এ সময় দিল্লির আন্দোলনের সমর্থনে বিভিন্ন স্লোগান দেন শিক্ষার্থীরা।

এদিকে, ২৪ জুলাই কলকাতায় কর্মসূচির পরিকল্পনা করেছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। এ লক্ষ্যে কলকাতা পুলিশের কাছে মিছিলের অনুমতি চেয়ে ই-মেইল করেছে সংগঠনটি।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বিকেল ৪টায় কলেজ স্কোয়ার থেকে রানি রাসমণি রোড পর্যন্ত মিছিলের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রায় দেড় হাজার মানুষের অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ছাত্র-যুব সমাজকে মিছিলে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও শিক্ষা দুর্নীতিসহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে যাদের নাম জড়িয়েছে, তাদের দূরে থাকার অনুরোধ করা হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে আরও জানা যায়, সিজেপির সদস্য পরিচয় দিয়ে দেবদীপ গঙ্গোপাধ্যায় গত ১৯ ও ২১ জুলাই মিছিলের অনুমতি চেয়ে কলকাতা পুলিশের যুগ্ম কমিশনারদের কাছে আবেদন করেন। সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানান, এখনও অনুমতি মেলেনি। তবে অনুমতি ছাড়াই মিছিল হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে সব ধরনের প্রস্তুতি রাখছে পুলিশ।

দিল্লির পাশাপাশি মুম্বাই, চেন্নাইসহ বিভিন্ন শহরেও সিজেপির আন্দোলনের সমর্থনে বিক্ষোভ হয়েছে। মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্ক, চৈত্যভূমি, চেম্বুর ও শিবসেনা ভবনের সামনে জমায়েত হলেও মুম্বাই পুলিশ জানিয়েছে, এসব কর্মসূচির জন্য আগাম অনুমতি নেওয়া হয়নি। চেন্নাইয়ের টি-নগর এলাকায়ও বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে অংশ নেন। বিদেশের বিভিন্ন স্থানেও একই ইস্যুতে বিক্ষোভ হয়েছে বলে বিভিন্ন মাধ্যমে জানা গেছে।

গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে দিল্লির যন্তর মন্তরে অবস্থান করছেন সিজেপির সমর্থকরা। আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন অভিনেত্রী শাবানা আজমি, সোনাক্ষী সিনহাসহ বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তি। আন্দোলনকারীদের সমর্থনে অনশনে বসা সোনম ওয়াংচুককে ২০ দিনের অনশনের পর যন্তর মন্তর থেকে সরিয়ে নিয়ে যায় পুলিশ।

এদিকে, নিট পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়ে গেলেও চার দফা দাবিতে অনড় রয়েছে সিজেপি। তাদের দাবি- শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, সংসদ অভিযানে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের বলপ্রয়োগের ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও এফআইআর প্রত্যাহার, মোদী সরকারের ক্ষমাপ্রার্থনা এবং সংসদে কেন্দ্রীয় শিক্ষানীতি নিয়ে আলোচনা।

এই পরিস্থিতিতে সিজেপিকে সরাসরি সমর্থন না দিলেও ছাত্র-যুবদের আন্দোলনে পুলিশি দমন-পীড়নের অভিযোগ তুলে ২১ জুলাই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারি বাসভবনের সামনে বিক্ষোভে বসে আটক হন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। তার সঙ্গে ছিলেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, অখিলেশ যাদবসহ বিরোধী জোটের একাধিক নেতা।

রাহুলকে পুলিশ গাড়িতে তোলার সময় তার নাক থেকে রক্তপাতও হয়েছে বলে জানা যায়। ২৩ জুলাই সাংবাদিক বৈঠকে রাহুল তিনটি দাবিতে অনড় থাকার কথা জানান- ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা, দিল্লিতে ছাত্রদের ওপর হামলার ঘটনার বিচার এবং প্রধানমন্ত্রী মোদীর ক্ষমাপ্রার্থনা। তবে তিনি সিজেপির নাম উল্লেখ করেননি।

এদিকে, সিজেপি প্রতিনিধিদের আবারও আলোচনায় ডেকেছে কেন্দ্র। বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংহ জানান, সরকার যে কোনো সময় আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। প্রতিনিধি দলে থাকবেন মন্ত্রী জেপি নড্ডাও। একই সঙ্গে সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু জানিয়েছেন, নিট ইস্যুতে সংসদে আলোচনায় সরকারের আপত্তি নেই। তবে কোনো পূর্বশর্ত মেনে আলোচনা হবে না।

ওই ঘোষণার পরেই মোদীর উদ্দেশে তিন দফা দাবি তুলে ধরেছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। যারমধ্যে অন্যতম সরকারের ক্ষমাপ্রার্থনা এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ধর্মেন্দ্র প্রধানের অপসারণ।

এ অবস্থায় কেন্দ্র সরকারও জানিয়ে দিয়েছে, সংসদ ভবনে আলোচনার জন্য কোনও শর্ত চাপানো যাবে না। মন্ত্রী কিরন রিজিজু বলেছেন, আমরা তৈরি, কিন্তু আপনারা শর্ত জুড়ে দিচ্ছেন। কোনও অজুহাত দেবেন না। শর্ত বা অজুহাত দিলেই সবাই বুঝে যাবে যে আপনারা আসলে আলোচনা এড়িয়ে যেতে চাইছেন।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘোষণা করেন, নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে ফাস্ট ট্র্যাক আদালত গঠন করা হবে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করাই সরকারের অগ্রাধিকার।

অন্যদিকে, সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে ‘নিউজ ১৮’ জানিয়েছে, সোনম ওয়াংচুক ধর্মেন্দ্র প্রধানের অপসারণ দাবি থেকে সরে এসেছেন। যদিও প্রকাশ্যে তিনি এমন কোনো মন্তব্য করেননি।

ওই সূত্রের দাবি, এতে অচলাবস্থা কাটার সম্ভাবনা তৈরি হলেও সিজেপি এখনও নিজেদের অবস্থানে অনড়। ফলে কেন্দ্রের আলোচনার আহ্বান ও সংসদে আলোচনা নিয়ে ইতিবাচক বার্তা এলেও সিজেপি তাদের দাবিতে অনড় রয়েছে। আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেদিকেই সবার নজর।