দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের আকস্মিক পদত্যাগের পর শিগগিরই নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সাংবিধানিক নির্দেশনার আলোকে আগামী রোববার বা তার পরবর্তী দিনে ইসি সচিবালয়ে এই বিষয়ে কমিশন সভা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আর সেই সভাতেই ২৩ তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক সময়সূচি বা তফসিল ঘোষণার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ।
এদিকে, রাষ্ট্রপ্রধানের পদ খালি হওয়ার পর পরই সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
গুরুতর অসুস্থতায় রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ
গুরুতর অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগপত্রে সই করেন বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পদত্যাগপত্রটি স্পিকারের কাছে পাঠানো হয়।
পদত্যাগপত্রে বিদায়ী রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন:
‘আমি গুরুতর অসুস্থ। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছি। আমার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে। ইদানিং স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অটোনমিক নিউরোপ্যাথি নামক রোগ শনাক্ত হয়েছে। এই রোগের কারণে আমি মাঝে মাঝে ক্ষণিক অচেতন হয়ে যাই। এসব রোগের প্রাদুর্ভাবে শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যের কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আমার দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসা প্রয়োজন। এ অবস্থায় সংবিধানের ৫০ (৩) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করছি।’
জরুরি সংবাদ সম্মেলনে পদত্যাগপত্র প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেন স্পিকার এবং নিজেই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেন। স্পিকার পদে শপথ নেওয়ার সময়ই সংবিধান অনুযায়ী প্রয়োজন সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের শপথ নেওয়া থাকে বলে তিনি স্পষ্ট করেন।
সংবিধান ও নির্বাচন কমিশন সংক্রান্ত আইনি বাধ্যবাধকতা
বাংলাদেশের সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান অনুযায়ী এ নির্বাচনের যাবতীয় আয়োজন পরিচালিত হচ্ছে:
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৮ ও ১১৯ (ইসির ক্ষমতা ও দায়িত্ব): অনুচ্ছেদ ১১৮ অনুযায়ী গঠিত একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের ওপর সংবিধানের ১১৯ (১)(ঘ) অনুচ্ছেদের অধীনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনা ও ভোটাভুটির সার্বিক তত্ত্বাবধান, নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ন্যস্ত থাকে।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১২৩ (২) (নির্বাচনের সময়সীমা): পদত্যাগ, মৃত্যু বা অপসারণজনিত কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পদটি শূন্য হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান বাধ্যতামূলক।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৮ (৪) (যোগ্যতা): রাষ্ট্রপতির পদে প্রার্থী হতে হলে ন্যূনতম ৩৫ বছর বয়সের বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ (সিইসি-এর ভূমিকা): ১৯৯১ সালের আইন অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নিজেই এই নির্বাচনে প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা বা ‘নির্বাচনী কর্তা’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
৯০ দিনের বাধ্যবাধকতা: প্রস্তুতিতে ইসি
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সার্বিক প্রক্রিয়া নিয়ে সারাবাংলাকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি সইসহ পদত্যাগপত্র দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পদটি সাংবিধানিকভাবে শূন্য হয়ে গেছে। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার অ্যাক্টিং রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ ও ‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১’ অনুযায়ী শূন্য পদ পূরণে আগামী ৯০ দিনের মধ্যেই আমরা নির্বাচন আয়োজন করবো। এতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজেই রিটার্নিং কর্মকর্তার (নির্বাচনি কর্তা) দায়িত্ব পালন করবেন। জানান, আজ শনিবার (২৫ জুলাই) সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় ইসির কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। আগামী রোববার (২৬ জুলাই) বা তার পরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফশিলের বিষয়ে ইসি সিদ্ধান্ত নেবে।’
ইসি সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন পরিচালনার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে সংসদ সচিবালয়ে স্পিকারের সঙ্গে সিইসির সাক্ষাতের আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হবে। সংসদ সদস্যদের নাম, বিভক্তি সংখ্যা ও আসন উল্লেখ করে তালিকা পাওয়ার পর ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য সমন্বয়ে হালনাগাদ ভোটার তালিকা প্রকাশ করবে ইসি। এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের ৩৫০ জন সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার। সেই অনুযায়ী ভোটার তালিকা তৈরি করা হবে এবং এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মত ও সংস্কারের প্রস্তাবনা
বর্তমান প্রেক্ষাপটে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ এবং নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. মোহাম্মদ আব্দুল আলীম সার্বিক প্রক্রিয়ার মূল্যায়ন করে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর, এখন নির্বাচনের কাজটা এগিয়ে নেবে নির্বাচন কমিশন। আর এই নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার থাকেন রিটার্নিং কর্মকর্তা আর ভোট দিয়ে থাকেন সংসদ সদস্যরা। তবে আমাদের বিগত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ইতিহাসে মাত্র একবারই এই নির্বাচন হয়েছিল। তাই আবারো যদি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন হয়, অবাক হওয়ার কিছু নেই; কারণ সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।’
পদটিকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা প্রসঙ্গে তিনি আরও যোগ করেন, ‘সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আমাদের কিছু পরামর্শ ছিলো। আমরা দল থেকে রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন করলেও ভোটার হিসেবে জনগণের অংশগ্রহণের বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছিলাম, যেন এই পদটি দলীয়করণের মাঝেই না আটকে থাকে। তবে এই মুহূর্তে আমার পরামর্শ থাকবে, রাষ্ট্রপতি দল থেকে নির্বাচিত হলেও পরবর্তীতে যেন তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত বা কাজে দলীয় চিন্তা-চেতনার বাইরে গিয়ে দায়িত্ব পালন করেন।’
নির্বাচনের প্রক্রিয়া ও শর্তাবলী
মনোনয়ন জমা: প্রার্থীকে সংসদ সদস্য হতে হবে না, তবে প্রার্থীর মনোনয়নপত্রে একজন সংসদ সদস্যকে ‘প্রস্তাবক’ এবং অন্য একজনকে ‘সমর্থক’ হিসেবে সই করতে হবে। প্রার্থীর নিজস্ব সম্মতিসূচক সইও থাকতে হবে।
ভোটাভুটি: ইসি ঘোষিত তফসিলে একাধিক প্রার্থী বৈধ বিবেচিত হলে জাতীয় সংসদ কক্ষে গোপন ব্যালটে ভোট গ্রহণ করা হবে। আর যদি একক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ হয়, তবে তাঁকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী ঘোষণা করবে ইসি।
এদিকে, সংসদের অধিবেশন না থাকলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন হলে স্পিকার সাত দিন আগে বৈঠক আহ্বান করতে পারেন। আর একাধিক প্রার্থী হলে সংসদের অধিবেশন কক্ষে নির্বাচনী কর্তা ভোটের আয়োজন করবেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ইতিহাস ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
স্বাধীনতার পর থেকে দেশে ২২ জন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন করলেও মেয়াদের হিসেবে এবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘২৩ তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন’। এবার ২৩ তম রাষ্ট্রপতির জন্য ভোটের অপেক্ষা।
এর আগে, সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরার পর ১৯৯১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একমাত্র গোপন ব্যালটে ভোটাভুটি হয়েছিল। সে সময় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট। পরবর্তী সময়ে ২০১৩, ২০১৮ এবং ২০২৩ সালের নির্বাচনসহ প্রায় প্রতিটি নির্বাচনেই একক প্রার্থী থাকায় ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।





