মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা মুছে ফেলার সুযোগ নেই: আ স ম রব

স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলক ও ডাকসুর সাবেক ভিপি আ স ম আবদুর রব ডাকসু সংগ্রহশালার প্রশ্নে গণমাধ্যমে বিবৃতি প্রদান করেছেন।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, ডাকসু সংগ্রহশালার বর্তমান প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক অর্জন ও তার পূর্বাপর সংগ্রামের ধারাবাহিকতাকে আড়াল করার একটি প্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে। ইতিহাস পুনর্বিন্যাসের নামে যদি ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐতিহাসিক ভূমিকা ও প্রতীকগুলোকে আড়াল করা হয় এবং তার বিপরীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, তাহলে তা ইতিহাসের নির্মোহ উপস্থাপন নয়; বরং ইতিহাস বিকৃতির একটি চর্চা। ইতিহাস কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দ কিংবা ব্যক্তিগত বিবেচনায় নির্ধারিত হতে পারে না।
তিনি বলেন, ডাকসু সংগ্রহশালা কোনো রাজনৈতিক দলের ইতিহাস প্রদর্শনীর স্থান নয়; এটি বাংলাদেশের ছাত্রসমাজের সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন ও স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। তাই ডাকসুর ইতিহাস সংরক্ষণ ও উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, দলীয় আনুগত্য কিংবা নির্বাচিত স্মৃতি নয়—ঐতিহাসিক সত্য, ধারাবাহিকতা, প্রেক্ষাপট ও নির্মোহতাই হতে হবে প্রধান বিবেচনা। কারও ব্যক্তিগত বিবেচনা বা পছন্দ-অপছন্দ দিয়ে ইতিহাস নির্ধারিত হতে পারে না।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে, ডাকসুর সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে একটি ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া তাঁর বক্তব্যের ছবি, যেখানে তিনি ঘোষণা করেছিলেন—‘কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। জিন্নাহর এই বক্তব্য বাংলাদেশের ছাত্রসমাজের সংগ্রাম বা ইতিহাসের অংশ নয়; বরং বাঙালির ভাষার অধিকার, আত্মপরিচয় ও রাজনৈতিক অধিকারের সংগ্রামের বিপরীত অবস্থানের একটি ঐতিহাসিক দলিল। ভাষা আন্দোলনই ছিল বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতার সংগ্রামের সূচনা পর্ব।
অথচ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধিকার ও স্বাধীনতার যে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, তার অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক প্রতীক ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের কোনো ছবি সংগ্রহশালায় স্থান পায়নি। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও ছাত্রসমাজের সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত ৭ মার্চের ভাষণের ছবি যেখানে স্থান পেল না, সেখানে তার বিপরীত রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিনিধিত্বকারী জিন্নাহর বক্তব্যের ছবি স্থান পাওয়া প্রাসঙ্গিক নয়
জিন্নাহ পাকিস্তানের ইতিহাসের জন্য ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ছিল বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার বিপরীত। অতএব, বাংলাদেশের ছাত্রসমাজের সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন ও স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসের স্মারক ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি স্থান দেওয়ার কোনো ঐতিহাসিক যৌক্তিকতা নেই। বিশেষ করে তাঁর উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার বক্তব্যের ছবি সেখানে স্থান পাওয়া এবং একই সময়ে ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের ছবি না থাকা ইতিহাসের নির্বাচন ও উপস্থাপনার ক্ষেত্রে গুরুতর অসামঞ্জস্য সৃষ্টি করেছে।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর নেতৃত্বে বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলন একটি নির্ধারক রাজনৈতিক পরিণতির দিকে অগ্রসর হয়েছিল। তাই স্বাধীনতা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভূমিকা অস্বীকার বা মুছে ফেলার কোনো সুযোগ নেই।
একই সঙ্গে আ স ম আবদুর রব বলেন, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের রাজনৈতিক ব্যর্থতা এবং পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার শাসনামলের রাজনৈতিক দায়কে একাকার করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। ইতিহাসের প্রতিটি পর্বকে তার নিজস্ব সময়, প্রেক্ষাপট, কার্যকারণ ও রাজনৈতিক দায়ের ভিত্তিতে বিচার করতে হবে। একটি সময়ের রাজনৈতিক ব্যর্থতা দিয়ে অন্য সময়ের ঐতিহাসিক অবদানকে অস্বীকার করা যেমন ইতিহাসের প্রতি অবিচার, তেমনি ঐতিহাসিক অবদানের আড়ালে পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক দায় ও জবাবদিহিকে আড়াল করাও ইতিহাসের প্রতি একই ধরনের অন্যায়। ইতিহাস কাউকে দায়মুক্তি দেয় না, আবার কারও অবদানও মুছে দেয় না।
আ স ম আবদুর রব বলেন, ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ইতিহাসের কোনো অধ্যায় মুছে ফেলে নতুন কোনো রাজনৈতিক ইতিহাস তৈরি করার জন্য সংঘটিত হয়নি। জনগণের অধিকার, গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা থেকেই গণঅভ্যুত্থানের জন্ম। অতএব, গণঅভ্যুত্থানের পর ইতিহাস পুনর্বিন্যাসের নামে যদি এক পক্ষের স্মৃতি মুছে অন্য পক্ষের প্রতীক প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাহলে তা ইতিহাসের মুক্তি নয়; বরং ইতিহাসের আরেক ধরনের রাজনৈতিক ব্যবহার।
মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক অর্জনকে আড়াল করে কিংবা তার পূর্বাপর সংগ্রামের ধারাবাহিকতা বিচ্ছিন্ন করে কোনো নতুন রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। ইতিহাসের সত্যকে আড়াল, বিকৃত বা একপেশেভাবে উপস্থাপনের যে কোনো প্রচেষ্টা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে প্রতারণা এবং মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক অর্জনের প্রতি অবমাননা। যারা ইতিহাস বিকৃতির এই চর্চায় যুক্ত হচ্ছেন, তাদের প্রত্যেককেই একদিন এই ঐতিহাসিক দায়ের জবাবদিহি করতে হবে।
তিনি ডাকসু সংগ্রহশালার প্রদর্শনী ও সংরক্ষিত উপকরণসমূহ নতুন করে পর্যালোচনা ও পুনর্বিন্যাসের দাবি জানান। এই পুনর্বিন্যাসের উদ্দেশ্য হবে কোনো ব্যক্তিকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা কিংবা কাউকে অযথা মহিমান্বিত করা নয়; বরং বাংলাদেশের ছাত্রসমাজের সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা অর্জনের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাকে যথাযথভাবে তুলে ধরা।