মধ্যপ্রাচ্যের উদ্ভূত যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তনের মুখে ভারতে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন। গত শনি ও রবিবার দিল্লির বিশাল গোলাকার টেবিলে মুখোমুখি বসেছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর কয়েকজন শীর্ষ নেতা। বৈশ্বিক এই সংকটময় মুহূর্তে সম্মেলনটি ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এক নতুন বার্তা এনে দিয়েছে। সম্মেলনের উদ্বোধন করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আহ্বান জানান, ব্রিকস সদস্যদেশগুলোকে একজোট হয়ে ভবিষ্যতে ‘নিয়মের অনুসারী’ নয়, বরং ‘নিয়ম নির্ধারণকারী’ হয়ে উঠতে হবে।
দিল্লির এই ঐতিহাসিক সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পাশাপাশি সরাসরি অংশ নেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা। তীব্র পারস্পরিক সংঘাত ও ভৌগোলিক অনাস্থার ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও এসব দেশের শীর্ষ নেতাদের এক ছাদের নিচে উপস্থিত করতে পারাকে ভারতের কূটনৈতিক প্রভাবের এক বিরাট সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২০ সালের বিতর্কিত সীমান্ত সংঘাতের ছায়া পেরিয়ে দীর্ঘ সাত বছর পর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নয়া দিল্লি সফর করলেন। অন্যদিকে, চলমান যুদ্ধের মধ্যেই ব্রিকস সদস্য সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছিল ইরান। সেই বৈরী পরিবেশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ও আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্সের মধ্যে শীর্ষপর্যায়ের এক বিরল ও অভূতপূর্ব মুখোমুখি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা কিছুদিন আগেও কল্পনা করা অসম্ভব ছিল।
চীন, রাশিয়া ও ইরানের মতো দেশগুলোর কাছে ব্রিকস মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের একক বৈশ্বিক প্রভাব কমিয়ে আনার বড় প্ল্যাটফর্ম। তবে ভারতকে কোনোভাবে পশ্চিমাবিরোধী জোটে রূপ দেওয়ার অনিচ্ছা পুনর্ব্যক্ত করে নরেন্দ্র মোদি স্পষ্ট করে বলেন, এই জোট ‘কারও বিরুদ্ধে নয়’। মতপার্থক্য ও অভ্যন্তরীণ বিভাজন এড়িয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর সদস্যদেশগুলো সম্মেলনের প্রথম দিনেই একটি সর্বসম্মত যৌথ ঘোষণাপত্র প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছে। এই ঘোষণাপত্রে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে ‘সর্বোচ্চ সংযম’ দেখানোর আহ্বান জানানোর পাশাপাশি ‘বেসামরিক অবকাঠামো ও শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার’ তীব্র নিন্দা জানানো হয়। ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল সংকটে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে ফিলিস্তিনিদের জোর করে বাস্তুচ্যুত করার বিরোধিতা করা হয়।
তবে ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত ভারসাম্যের কারণে যৌথ ঘোষণাপত্রে ইউক্রেন যুদ্ধের কোনো উল্লেখ ছিল না, যা ব্রিকসের পূর্ববর্তী ঘোষণার তুলনায় এক বিরাট ব্যতিক্রম। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ‘বাছবিচারহীনভাবে বাড়তে থাকা শুল্ক’ নিয়ে উদ্বেগ এবং একতরফা নিষেধাজ্ঞার নিন্দা করা হলেও সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’, কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং নৌবন্দর অবরোধের তীব্র চাপের মুখে থাকা তেহরানের জন্য এই দিল্লি সফর ছিল বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার বড় সুযোগ। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তার বক্তব্যে মালয়েশিয়া, ভারত ও ইথিওপিয়াসহ ব্রিকস সদস্যদের সঙ্গে আরও গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন।
অন্যদিকে, এশিয়ার দুই পরাশক্তি চীন ও ভারতের সম্পর্কে বরফ কিছুটা গললেও অনাস্থার ছাপ ছিল স্পষ্ট। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী মোদির মধ্যে শুভেচ্ছা বিনিময় ও করমর্দন হলেও মোদির বহুল পরিচিত উষ্ণ আলিঙ্গন দেখা যায়নি। ২৪ ঘণ্টার কম সময় দিল্লিতে অবস্থান করে জিনপিং নৈশভোজ এড়িয়ে গেলেও দুই দেশের সরকারি বিবৃতিতে ব্যবসায়িক সম্পর্ক, যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং বাণিজ্য বাধা দূর করার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
সূত্র: বিবিসি





