যুদ্ধক্ষেত্রে এআইয়ের দাপট: সামরিক প্রযুক্তির দৌড়ে শীর্ষে যেসব কোম্পানি

একসময় যুদ্ধ মানেই ছিল ট্যাংক, যুদ্ধবিমান, কামান, ক্ষেপণাস্ত্র ও ভারী অস্ত্রের লড়াই। এসব অস্ত্র তৈরি করত হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিরক্ষা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এবং যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করতেন সরাসরি সৈন্যরা।

কিন্তু সেই চিত্র দ্রুত বদলে গেছে। এখন যুদ্ধ পরিচালনায় ক্রমেই কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), আর অনেক সৈন্য যুদ্ধ পরিচালনা করছেন কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসেই।

ক্লাউড কম্পিউটিং, স্বয়ংক্রিয় ড্রোন, নজরদারি ব্যবস্থা, যুদ্ধক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ- সব ক্ষেত্রেই এআইভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী সামরিক-শিল্প জোট রূপ নিচ্ছে নতুন ‘সামরিক-প্রযুক্তি জোটে’।

বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই খাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হচ্ছে, যার বড় অংশ যাচ্ছে কয়েকটি প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের হাতে।

এআই-নির্ভর সামরিক ব্যবস্থার দ্রুত বিস্তার
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ন্যাটোসহ পশ্চিমা সামরিক জোটগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে এআই ব্যবহারে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে।

গত ১০ জুলাই যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ওমনিয়া ট্রেনিং কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে ১৫ বছরের জন্য ২০০ কোটি পাউন্ড (প্রায় ২৭০ কোটি মার্কিন ডলার) মূল্যের একটি চুক্তি করে। রে-থিয়ন ইউকের নেতৃত্বাধীন এই প্রকল্পের আওতায় প্রতি বছর প্রায় ৬০ হাজার ব্রিটিশ সেনাকে এআই ব্যবহার করে যুদ্ধ পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, যাতে বাহিনীকে আরও ‘যুদ্ধ-প্রস্তুত’ করা যায়।

এর কয়েক দিন আগে ন্যাটো তাদের ‘উন্নত বিমান কমান্ড এবং নিয়ন্ত্রণ ডেটা প্ল্যাটফর্ম’ পরিচালনার দায়িত্ব দেয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যান্ডুরিল ইন্ডাস্ট্রিজ, প্যালান্টির এবং ফ্রান্সের যৌথ সামরিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আথিয়া এসএএস-কে।
অ্যান্ডুরিলের ‘ল্যাটিস এআই’ সফটওয়্যার বিভিন্ন সেন্সর, ড্রোন ও নজরদারি ব্যবস্থার তথ্য একত্র করে যুদ্ধক্ষেত্রের একটি তাৎক্ষণিক ও সমন্বিত চিত্র তৈরি করতে সক্ষম।

যুদ্ধে এআইয়ের যাত্রা কোথা থেকে?
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান এআই-নির্ভর যুদ্ধব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি হয় ২০০০ ও ২০১০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন কর্মসূচির মাধ্যমে। তখন থেকেই দূরবর্তী নিয়ন্ত্রণে স্ক্রিনের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।

২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দফতর (পেন্টাগন) ‘থার্ড অফসেট স্ট্র্যাটেজি’ গ্রহণ করে, যেখানে ভবিষ্যতের যুদ্ধের কেন্দ্রীয় প্রযুক্তি হিসেবে এআইকে বিবেচনা করা হয়।

এরপর থেকে প্রতিরক্ষা খাতে এআই ব্যবহারের গতি ক্রমেই বেড়েছে। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২ দশমিক ৮৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ।

পেন্টাগনের ‘এআই-ফার্স্ট’ সামরিক পরিকল্পনা
সম্প্রতি পেন্টাগন বিশ্বের শীর্ষ আটটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে, যাতে তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে একটি ‘এআই-ফার্স্ট ফাইটিং ফোর্স’- এ রূপান্তর করা যায়।

এই চুক্তির আওতায় স্পেসএক্স, ওপেনএআই, গুগল, এনভিডিয়া, রিফ্লেকশন, মাইক্রোসফট, ওরাকল এবং অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের সর্বোচ্চ গোপনীয় কম্পিউটিং নেটওয়ার্ক আইএল৬ ও আইএল৭-এ কাজ করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

সামরিক এআই শিল্পের চার প্রধান স্তম্ভ
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট সামরিক এআই শিল্পকে চারটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করেছে।

১. প্রতিরক্ষা ঠিকাদার
এগুলো বহু দশক ধরে বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনীর জন্য যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, জাহাজ ও অস্ত্র তৈরি করে আসা ঐতিহ্যবাহী প্রতিরক্ষা কোম্পানি।
এই শ্রেণির শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে-

  • লকহিড মার্টিন
  • আরটিএক্স (সাবেক রেথিয়ন টেকনোলজিস)
  • নর্থরপ গ্রুম্যান
  • বিএই সিস্টেমস
  • জেনারেল ডায়নামিকস

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে। কারণ, তারা এখন প্রচলিত অস্ত্রের পাশাপাশি এআই প্রযুক্তিও যুক্ত করছে।

উদাহরণ হিসেবে, ‘লকহিড মার্টিন’ তাদের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানে এমন একটি এআই ব্যবস্থা পরীক্ষা করছে, যা পাইলটদের শত্রু বিমান দ্রুত শনাক্ত করতে সহায়তা করবে।

অন্যদিকে ‘এল৩হ্যারিস’ তাদের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ ব্যবস্থায় সরাসরি এআই যুক্ত করেছে। প্রতিষ্ঠানটি শিল্ড এআই-এর প্রযুক্তিও ব্যবহার করছে, যা শত্রুপক্ষের ড্রোন শনাক্ত করতে সক্ষম।

২. প্রতিরক্ষা স্টার্টআপ
এই নতুন প্রজন্মের প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত সফটওয়্যারনির্ভর এবং সামরিক বাহিনী, সীমান্তরক্ষী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য এআইভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রযুক্তি তৈরি করে।

সবচেয়ে আলোচিত প্রতিষ্ঠান প্যালান্টির।
পেন্টাগনের প্রজেক্ট ম্যাভেন-এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি উপগ্রহচিত্র, ড্রোন ভিডিও এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে পারে।

ইউক্রেন যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট তথ্যানুযায়ী, সর্বশেষ সংঘাতের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় ম্যাভেন প্রায় এক হাজার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করেছিল।

প্যালান্টিরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যান্ডুরিল। তাদের ল্যাটিস প্ল্যাটফর্ম ড্রোন, সেন্সর, নজরদারি টাওয়ার ও স্বয়ংক্রিয় যানবাহনের তথ্য একত্র করে একটি সমন্বিত কমান্ড ব্যবস্থা গড়ে তোলে, যা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

৩. বিগ টেক
বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও এখন প্রতিরক্ষা খাতে দ্রুত বাড়ছে। গুগল, মেটা এবং অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৬৭ শতাংশ ক্লাউড অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণ করে।

এসব প্রতিষ্ঠানের ক্লাউড ও কম্পিউটিং সক্ষমতা এখন সামরিক তথ্য সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যবহৃত হচ্ছে।

পেন্টাগনের সাম্প্রতিক চুক্তিতে স্পেসএক্স, ওপেনএআই, গুগল, এনভিডিয়া, মাইক্রোসফট, ওরাকল ও অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস -এর মতো প্রযুক্তি জায়ান্টদের যুক্ত করা হয়েছে।

৪. ফাউন্ডেশনাল মডেল নির্মাতা
এই শ্রেণির প্রতিষ্ঠানগুলো এমন এআই মডেল তৈরি করে, যার ওপর ভিত্তি করে অন্য কোম্পানিগুলো সামরিক সফটওয়্যার তৈরি করে।
এর মধ্যে রয়েছে-

  • ওপেন এআই
  • অ্যানথ্রপিক
  • মিস্ট্রাল এআই

চীনের গবেষকরাও সামরিক ব্যবহারের জন্য নিজস্ব এআই মডেল তৈরি করছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্যানুযায়ী, মেটার ‘লামা’ মডেলকে ভিত্তি করে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি ‘চ্যাটবিট’ নামে একটি এআই ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে।

পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, সামরিক এআই গবেষণায় চীনের বার্ষিক ব্যয়ও প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ কোটি মার্কিন ডলার।

এদিকে চলতি বছর পেন্টাগন আলিবাবা, বাইডু, বিওয়াইডি, এনআইও, রোবোসেন্স এবং ইউনিট্রি-কে চীনা সামরিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির তালিকায় যুক্ত করেছে।

প্রযুক্তি থেকে যুদ্ধের ময়দান
একসময় ওপেনএআইসহ অনেক শীর্ষ এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাদের প্রযুক্তি সামরিক কাজে ব্যবহারের বিরোধিতা করেছিল। তবে ২০২৪ সালে ওপেনএআই তাদের নীতিমালা পরিবর্তন করে সামরিক ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়।

একই বছর প্যালান্টির ও অ্যানথ্রপিক যৌথভাবে সামরিক এআই উন্নয়নে অংশীদারত্ব গড়ে তোলে। যদিও পরে তাদের মধ্যে প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয় নিয়ে আইনি বিরোধও দেখা দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এখন শুধু ট্যাংক, যুদ্ধবিমান কিংবা ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভর করছে না। সফটওয়্যার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং তথ্য বিশ্লেষণই ধীরে ধীরে আধুনিক যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রে পরিণত হচ্ছে। ফলে প্রতিরক্ষা শিল্পের কেন্দ্রবিন্দুও দ্রুত সরে যাচ্ছে অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান থেকে এআই ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর দিকে। সূত্র: আল-জাজিরা