‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে’ গানের মেসবা প্রতিবাদের ভাষা নিয়ে যা বলছেন

কখনো পুরোনো হয় না কিছু গান। সময় পেরিয়ে গেলেও সুর আর কথার আবেগ নতুন করে ছুঁয়ে যায় শ্রোতাদের। তেমনই এক গান ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’। দীর্ঘদিন পর আবারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ডিফ্রেন্ট টাচের জনপ্রিয় এই গান।

ফেসবুকে এখন অনেকের ছবি, ভিডিও কিংবা বিশেষ মুহূর্তের সঙ্গে শোনা যাচ্ছে—‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে…’। তবে এবার শুধু বিনোদনের জন্য নয়, একটি ঘটনার প্রতিবাদ ও সংহতি প্রকাশের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার হচ্ছে গানটি।

সিলেটের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে ঘিরে সাইবার বুলিংয়ের ঘটনার প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষক, শিল্পীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ গানটি ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থান জানাচ্ছেন। আর সেই সূত্রেই নতুন করে আলোচনায় এসেছেন গানটির কণ্ঠশিল্পী ডিফ্রেন্ট টাচের ভোকাল মেসবা রহমান।

১৯৮৭ সালের এক বর্ষার রাতে জন্ম হয়েছিল গানটির। নতুন অ্যালবামের জন্য একটি গানের প্রয়োজন ছিল ডিফ্রেন্ট টাচের। টানা বৃষ্টির মধ্যে গীতিকার আশরাফ বাবুর মনে আসে—‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’। সেই রাতেই লেখা হয় গানটির কথা।

পরে মেসবা রহমানের কণ্ঠে গানটি হয়ে ওঠে ডিফ্রেন্ট টাচের অন্যতম পরিচয়। কয়েক দশক পরও গানটির আবেদন কমেনি। বরং নতুন প্রজন্মের কাছে আবারও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে শ্রাবণের আবেগমাখা এই গান।

গানটি নতুন করে আলোচনায় আসায় মেসবা রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, শ্রোতাদের ভালোবাসাই একটি গানকে সময়ের পর সময় বাঁচিয়ে রাখে। ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’র প্রসঙ্গ তুলতেই মেসবা বললেন, ‘মানুষের প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ডিফ্রেন্ট টাচের গান নতুন করে ছড়িয়ে পড়ছে, এটা আমাদের প্রাপ্তি।

মেসবা মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ নানা অনুভূতি প্রকাশ করেন। অনেক সময় সেগুলো বিতর্কও তৈরি করে। তবে বিউটি রানী পালের ভিডিওতে আপত্তিকর কিছু দেখেননি তিনি। আর মানুষের সংহতি প্রকাশের ভাষা হিসেবে গানটি নতুন করে ছড়িয়ে পড়াকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন।

‘শ্রাবণের মেঘগুলো’কে ঘিরে মেসবার স্মৃতির ঝুলিতেও রয়েছে মজার ঘটনা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কনসার্টের কথা বলতে গিয়ে হেসে ওঠেন তিনি। প্রথম বছর মুক্তমঞ্চে গানটি শুরু করতেই নেমেছিল অঝোর বৃষ্টি। দামি বাদ্যযন্ত্র রক্ষার জন্য অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। আয়োজকেরা পরের বছর আবার আমন্ত্রণ জানান। কাকতালীয়ভাবে সেবারও একই ঘটনা ঘটে। এটি আজও তাঁর কাছে মধুর স্মৃতি হয়ে আছে।

শুধু জাহাঙ্গীরনগর নয়, দেশে কিংবা বিদেশে, যেখানেই ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ শুরু হয়, সেখানেই দর্শকের উচ্ছ্বাস দেখতে পান মেসবা। অনেক সময় তাঁকে পুরো গান গাইতেও হয় না। মাঝখানে কোনো লাইন ভুলে গেলে দর্শকেরাই গেয়ে দেন পুরো গান। শিল্পীর কাছে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে!

মেসবার মতে, গানটির সাফল্যের পেছনে শুধু কথা বা সুর নয়, কম্পোজিশনেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। তাঁর ভাষায়, গানের শুরুতেই গিটারের যে পরিচিত সাউন্ড, সেখান থেকেই শ্রোতার সঙ্গে আবেগের সংযোগ তৈরি হয়। ভালো কম্পোজিশন না হলে অনেক ভালো গানও মানুষের কাছে ঠিকভাবে পৌঁছায় না।

মেসবা জানালেন, এখন ব্যস্ত সময় কাটছে। দেশে-বিদেশে নিয়মিত কনসার্ট করছেন। সম্প্রতি গাজীপুর, কুমিল্লা, খুলনা ও বগুড়ায় স্টেজ শো করেছেন। অংশ নিয়েছেন সংসদ ভবনের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ কনসার্টে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি সুফিয়া কামাল হলেও গান গেয়েছেন। পাশাপাশি চলছে নতুন গান তৈরির কাজ।

মেসবা জানান, বেশ কয়েকটি নতুন গান ইতিমধ্যে স্টেজে গাওয়া হচ্ছে। শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়াও আশাব্যঞ্জক। তাঁর বিশ্বাস, ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’, ‘দৃষ্টি প্রদীপ’ কিংবা ‘মন কী যে চায়’-এর মতো নতুন গানগুলোও দীর্ঘদিন মানুষের মনে জায়গা করে নেবে। স্টুডিওতে চলছে শেষ মুহূর্তের কাজ। এবার শুধু অডিও নয়, ভিডিওসহ নিজেদের ইউটিউব চ্যানেল থেকেই গানগুলো প্রকাশ করবেন তাঁরা। আপাতত একক গান প্রকাশের পরিকল্পনা থাকলেও পরে একসঙ্গে কয়েকটি গান নিয়ে বিশেষ আয়োজনের ইচ্ছাও রয়েছে।

‘শ্রাবণের মেঘগুলো’কে ঘিরে সাম্প্রতিক আলোচনাকে নতুন দায়িত্ব হিসেবেই দেখছেন মেসবা। নতুন প্রজন্ম আবার ডিফ্রেন্ট টাচকে খুঁজে নিচ্ছে, এটা তাঁকে যেমন আনন্দ দিচ্ছে, তেমনি নতুন গান প্রকাশের তাগিদও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই দ্রুতই নতুন কাজ শেষ করে শ্রোতাদের সামনে হাজির হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন মেসবা।