ঘরোয়া ক্রিকেটে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও প্রত্যাশিত বাণিজ্যিক সাফল্য না পাওয়ায় এবার ঘরোয়া ক্রিকেটকে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে বোর্ড। লক্ষ্য শুধু ব্যয় কমানো নয়, বরং ঘরোয়া প্রতিযোগিতাগুলোকে এমন একটি স্বনির্ভর কাঠামোয় নিয়ে যাওয়া, যেখানে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বাড়বে, প্রতিযোগিতা হবে আরও আকর্ষণীয় এবং সেই আয় আবার বিনিয়োগ করা হবে ক্রিকেটের উন্নয়নে।
বিসিবির টুর্নামেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান সিরাজুদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর জানিয়েছেন, বর্তমানে বছরে ৫০ কোটির বেশি টাকা ব্যয় হয় ঘরোয়া ক্রিকেট পরিচালনায়। নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে বছরে অন্তত ১৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। তার ভাষায়, পরিচালন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি প্রতিযোগিতাগুলোকে বাজারজাত করার মাধ্যমে নতুন আয়ের উৎস তৈরি করাই এখন প্রধান লক্ষ্য।
এই পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগ (বিসিএল) চার দিনের, বিসিএল একদিনের এবং ন্যাশনাল ক্রিকেট লিগের (এনসিএল) টি-টোয়েন্টি সংস্করণকে একত্রে একটি বাণিজ্যিক প্যাকেজে রূপ দেওয়া। প্রস্তাবিত মডেলে ছয়টি ব্যক্তিমালিকানাধীন দল এসব প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে। তবে দেশের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী প্রথম-শ্রেণির আসর আট দলের চার দিনের এনসিএল আগের কাঠামোতেই অনুষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি দ্বিতীয় সারির ক্রিকেটারদের জন্য চালু করা হবে তিন দিনের এনসিএল সেকেন্ড একাদশ টুর্নামেন্ট।
আলমগীরের মতে, মালিকানাভিত্তিক এই মডেলকে বিপিএলের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার সুযোগ নেই। এখানে কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি ফি থাকবে না। দলগুলোর দায়িত্ব হবে বিসিবির নির্ধারিত কাঠামো অনুযায়ী খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক দেওয়া। এতে বোর্ডের আর্থিক চাপ কমবে, আবার খেলোয়াড়দের পাওনা পরিশোধেও গতি আসবে। বাণিজ্যিকভাবে সফল হলে খেলোয়াড়দের অগ্রিম পারিশ্রমিক দেওয়ার সুযোগও তৈরি হবে, যা দীর্ঘদিনের একটি সমস্যার সমাধান করতে পারে।
ঘরোয়া ক্রিকেটের মান বাড়াতে বিদেশি ক্রিকেটার অন্তর্ভুক্তির দিকেও নজর দিচ্ছে বিসিবি। ‘প্লেয়ার এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম’-এর আওতায় বিদেশি ক্রিকেটাররা বাংলাদেশে খেলবেন, আবার দেশের ক্রিকেটাররাও বিদেশি লিগে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। বোর্ডের বিশ্বাস, এতে শুধু প্রতিযোগিতার মানই বাড়বে না, স্থানীয় ক্রিকেটারদের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও সমৃদ্ধ হবে।
সংস্কারের অংশ হিসেবে ক্রিকেটার তৈরির ভিত্তিও শক্তিশালী করতে চায় বিসিবি। সে লক্ষ্যেই অনূর্ধ্ব-২৩ ক্রিকেটারদের জন্য ‘রাইজিং স্টার’ টুর্নামেন্ট এবং ‘আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট লিগ’ চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জেলা পর্যায়ে নিয়মিত প্রতিযোগিতা আয়োজনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলা বিসিবির কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবে এবং ধাপে ধাপে দেশের ৬৪ জেলাতেই এই প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হবে।
ঘরোয়া ক্রিকেটকে কেবল একটি প্রতিযোগিতা হিসেবে নয়, বরং একটি টেকসই ও বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর ক্রীড়া কাঠামোয় রূপ দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছে বিসিবি। পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের ক্রিকেটে আর্থিক শৃঙ্খলা, প্রতিযোগিতার মান এবং খেলোয়াড় উন্নয়ন-তিন ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছে বোর্ড।





