গ্যাস ও বৃষ্টির অপেক্ষায় নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ!

দেশজুড়ে গ্যাস সংকটের পাশাপাশি শুরু হয়েছে ভয়াবহ লোডশেডিং। নিকট অতীতে এত ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের নজীর নেই। কোন কোন এলাকায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের খবর পাওয়া যাচ্ছে।

ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের জন্য গ্যাস সংকটকে দায় দিচ্ছেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম। তিনি বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় ২২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। অন্যদিকে গ্যাস সংকটের কারণে ইলেকট্রিক চুলার ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। একইসঙ্গে গ্যাসভিত্তিক ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকায় বিদ্যুতের উপর চাপ বেড়ে যাওয়ায় ঘাটতি বেড়েছে।

তিনি বলেন, গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো পুরোমাত্রায় চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি রাতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৩৫০০ মেগাওয়াটের মতো উৎপাদন করেও ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।

এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউ চালুর বিষয়ে আভাস পাওয়া গেছে। আমরা আশা করছি আজ রাত অথবা কালকে (৬ আগস্ট) থেকে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়বে। তাহলে বিদ্যুতের উৎপাদনও বেড়ে যাবে। তখন লোডশেডিং কিছুটা কমে আসবে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী ৪ আগস্ট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ২৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ দেওয়া হয়েছে ৬৫৮মিলিয়ন ঘনফুট। গ্যাসের ভয়াবহ সংকট শুরুর আগে ২০ জুলাই ৯৫৮ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ দেওয়া হয়।সাধারণ দৈনিক ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস দেওয়া হয়। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি গ্যাস ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বেকার বসে থাকে।

তবে এবারের লোডশেডিংয়ের ধরণ খানিকটা ভিন্ন দেখা যাচ্ছে। অতীতে দেখা গেছে সন্ধ্যা থেকে রাত ৯ টার পর‌্যন্ত চাহিদা বেশি হতো। শিল্পকারখানা ও বাজারঘাট বন্ধ হলে মধ্যরাতে লোডশেডিং কমে আসতো। কিন্তু এখন রাত ১২ টা এবং ১ টার দিকে চাহিদা থাকছে সবচেয়ে বেশি। যে কারণে রাতের চাহিদা সামাল দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য অনুযায়ী ৩ আগস্ট রাত ১২ টায় ৩২৫১ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়েছে। ওই সময়ে চাহিদা উল্লেখ করা হয়েছে ১৭ হাজার ৩৭৪ মেগাওয়াট, আর উৎপাদন করা হয়েছে মাত্র ১৩ হাজার ৯৭৭ মেগাওয়াট। রাত ১ টায় লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল ৩৫১২ মেগাওয়াট। ওইদিন রাত ৯ টায় সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ৩০৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে। দিনের বেশিরভাগ সময় ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল উৎপাদন।

পরদিন ৪ আগস্ট উৎপাদন আরও কমে গেছে। এদিন রাত সাড়ে ৯ টায় সর্বোচ্চ উৎপাদন করা হয়েছে ১৫ হাজার ৪৮ মেগাওয়াট। অন্যান্য সময়ে ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটে আটকে ছিল উৎপাদন। গ্যাস সংকট শুরু হওয়ার আগে ২০ জুলাই রাত ১২ টায় সর্বোচ্চ উৎপাদন করা হয়েছে ১৬ হাজার ৬৯ মেগাওয়াট। ওই সময়ে লোডশেডিং উল্লেখ করা হয়েছে ৭৮১ মেগাওয়াট। দিনের অন্যান্য সময় ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াটে আটকে ছিল উৎপাদন। ২৯ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা আর ১৬ হাজার মেগাওয়াটের উপরে গেলেই লোডশেডিং নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশন (বিইপপএ) প্রেসিডেন্ট কে এম রেজাউল হাসনাত বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, বিদ্যুতের নেট (প্রকৃত) উৎপাদন ক্ষমতা ১৭ হাজার থেকে ১৮ হাজার মেগাওয়াট। যে কারণে কোন একটি জ্বালানির ঘাটতি হলে পূরণ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, বিদ্যুতের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট। গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় ৮ হাজার মেগাওয়াট বন্ধ থাকছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণসহ নানা কারণে বন্ধ থাকা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাদ দিলে কয়েকদিন ধরে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে। তেলভিত্তিক ৪৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র থাকলেও নানা জ্বালানি সংকটসহ নানা কারণে ৩০০০ মেগাওয়াটের মতো উৎপাদন হচ্ছে।

মৌসুমের শুরুতে বিপিডিবির প্রক্কলনে বলা হয়, চলতি বছর বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা হবে ১৮৫০০ মেগাওয়াট। ওই পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ দিতে হলে ১২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ জরুরি। পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ১২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস থেকে আসবে ৬৮৪০ মেগাওয়াট, কয়লাভিত্তিক (পয়রা, রামপাল, মাতারবাড়ি, বাঁশখালী, বরিশাল, বড়পুকুরিয়া এবং আরএনপিএল) বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৫৯৫১ মেগাওয়াট, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক ৩২১৩ মেগাওয়াট, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৪০ মেগাওয়াট, বায়ু ও সৌর থেকে ২০ মেগাওয়াট, আদানি থেকে ১৪৩৬ মেগাওয়াট এবং ভারত সরকার থেকে ১ হাজার মেগাওয়াট আমদানির কথা বলা হয়েছে।

বিপিডিবির প্রক্কলন অনুযায়ী ১২০০ মিলিয়ন ঘনফুট পেলেও প্রায় অর্ধেক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বেকার বসে থাকে। বর্তমানে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে ১২২০৪ মেগাওয়াট। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট সিস্টেমে থাকছে না গ্যাস সংকটের কারণে। সেখানে বর্তমানে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে ৬৫৮ মিলিয়ন ঘনফুট।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপরেশন এন্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম বলেছেন, সব ঠিক থাকলে বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) আংশিকভাবে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) চালুর আশা করা হচ্ছে। গ্যাস সরবরাহ শুরু করার জন্য মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) রাত থেকে কুলডাউন শুরু হয়েছে। পুরোপুরি চালু হতে আরও কয়েকদিন সময় লাগবে।

অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউ চালু হলেও ৯০০ মিলিয়নের বেশি দেওয়ার মতো বাস্তবতা নেই। কারণে প্রতিদিনেই দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে কয়েক লাখ ঘনফুট। নানা কারণে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। কারণ বৃষ্টি হলে তাপমাত্রা কিছুটা কমে গেলে চাহিদা কমে যায়।