ভারতে দুই বছর যেভাবে দিন কাটছে আওয়ামী লীগের নেতাদের

বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা হারিয়ে ভারতে চলে যাওয়া আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী দুই বছর পরও দেশটির বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করছেন। তাদের কয়েকজন জানিয়েছেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পর তারাও বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, সাবেক সংসদ সদস্য এবং সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ের অন্তত ৭০ জন পশ্চিমবঙ্গে, বিশেষ করে কলকাতা ও আশপাশের এলাকায় অবস্থান করছেন। এ ছাড়া পুলিশের বিভিন্ন পদমর্যাদার প্রায় ৪০ কর্মকর্তাও সেখানে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

একসময় শুধু সাবেক সংসদ সদস্যদের মধ্যেই প্রায় ৭০ জন কলকাতা ও আশপাশের এলাকায় অবস্থান করছিলেন। সহযোগী সংগঠনের নেতা, জেলা পর্যায়ের নেতাকর্মী, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাসহ এই সংখ্যা প্রায় ২০০-তে পৌঁছেছিল। আর তৃণমূল ও মধ্যম পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সংখ্যা কলকাতা, শিলিগুড়ি, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় এক হাজারের বেশি ছিল বলে দলীয় সূত্রের দাবি।

তবে ভারতে আসা অনেক নেতা পরে নিজেদের সামর্থ্য ও যোগাযোগের ভিত্তিতে ইউরোপ, আমেরিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে চলে গেছেন। বিবিসি বাংলার সঙ্গে কথা বলা নেতাদের কয়েকজন দাবি করেছেন, তারা বিদেশে থেকেও দলের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক তৎপরতাই তাদের কর্মকাণ্ডের বড় অংশ।

বুধবার দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে সাংবাদিকদের শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এর আগে একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাকেও তিনি একই কথা জানিয়েছিলেন। এরপর ভারতে থাকা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের কেউ কেউ দেশে ফেরার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন।

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বিবিসি বাংলাকে বলেন, শেখ হাসিনার ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তারাও দেশে ফিরে বিচারের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত। তার দাবি, তাদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো মিথ্যা এবং দেশে ফিরলে তারা বিষয়টি প্রমাণ করতে চান।

ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনও দেশে ফেরার মানসিক প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। তার দাবি, ভবিষ্যতে কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন, সে বিষয়ে তাদের ধারণা রয়েছে।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের অনেক নেতা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকছেন। কারও সঙ্গে পরিবার নেই, আবার কয়েকজন মিলে একটি বাসায় থাকার ঘটনাও রয়েছে। আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা নিয়ে চলছেন বলে তাদের কয়েকজন জানিয়েছেন। বাংলাদেশে থাকার সময়ের তুলনায় অনেকের জীবনযাত্রার মানও কমেছে। নিজস্ব গাড়ির পরিবর্তে ট্যাক্সি বা গণপরিবহন ব্যবহার করছেন তারা।

ভারতে আসার পর প্রথম দিকে অনেক নেতাকর্মী কঠিন সময় পার করেছেন বলে জানিয়েছেন। সাবেক সংসদ সদস্য পঙ্কজ নাথ জানান, একপর্যায়ে তাকে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে অবস্থান করতে হয়েছে এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য অন্যের ফোন ব্যবহার করেছেন।

ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন জানান, ৫ আগস্টের পর দীর্ঘ সময় তিনি বাংলাদেশেই আত্মগোপনে ছিলেন। পরিস্থিতির কারণে বারবার স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে। পরে দমন-পীড়নের পরিস্থিতি বাড়লে তিনি দেশ ছাড়েন বলে জানান।

অভিনেত্রী ও আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে পরিচিত রোকেয়া প্রাচীও প্রায় দেড় বছর বাংলাদেশে আত্মগোপনে থাকার কথা জানিয়েছেন। নিজের পরিচয় গোপন রাখতে একাধিক সিম পরিবর্তন এবং একপর্যায়ে বোরকা পরে বাসা থেকে বের হওয়ার কথাও জানান তিনি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ পরিচালিত হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে দেশে থাকা নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন তারা। কলকাতা ও আশপাশে থাকা নেতারা নিজেদের মধ্যে বৈঠকও করেন।

এর আগে কলকাতার কাছে একটি বাণিজ্যিক অফিস নিয়ে সেখানে বৈঠক করতেন আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা। ওই স্থানকে তারা নিজেদের মধ্যে ‘পার্টি অফিস’ হিসেবে ব্যবহার করতেন বলে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের পর আওয়ামী লীগ কলকাতায় কোনো দলীয় কার্যালয় স্থাপনের বিষয়টি অস্বীকার করে। বর্তমানে ওই অফিসও ব্যবহার করা হচ্ছে না বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।

শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রথম বছর সরাসরি নেতাদের সাক্ষাতের তথ্য না থাকলেও পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা ছোট ছোট দলে দিল্লিতে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলে বিবিসি জানতে পেরেছে।

সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী জানান, গত দুই বছরে তিনি দলীয় কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রতিবেদন পাঠানোর কাজ করেছেন।

অন্যদিকে সাদ্দাম হোসেনের দাবি, বাংলাদেশে থাকা নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, কমিটি পুনর্গঠন, চলমান মামলায় সহায়তা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার কাজের মধ্য দিয়েই তাদের সময় কাটছে।

দেশে ফেরার বিষয়ে তিনি বলেন, মানসিক ও পারিবারিকভাবে তারা প্রস্তুত। এখন শুধু সময়সূচির অপেক্ষা।