ছয় বছরে ৩৭ শতাংশ কমে দিনাজপুর বোর্ডের পাশের হার এবারে সর্বনিম্ন

২০২৬ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষার বিস্তারিত ফল প্রকাশ করা হয়েছে। এ বছর দিনাজপুর বোর্ডে পাসের হার নেমে এসেছে ৫৮ দশমিক ০৫ শতাংশে। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার পাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে ফলাফলে ছাত্রদের তুলনায় ভালো করেছে ছাত্রীরা। পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তি উভয় ক্ষেত্রেই ছাত্রীরা এগিয়ে রয়েছে। ২০২১ সালের তুলনায় পাসের হার প্রায় ৩৭ শতাংশ কমেছে। ২০২১ সালে এই বোর্ডের পাসের হার ছিল ৯৪.৮০ শতাংশ।

সোমবার (১০ আগস্ট) সকাল ১০টায় দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মো. বোরহান উদ্দিন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে ফলাফলের বিস্তারিত পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়।

দিনাজপুর বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর মোট ১ লাখ ৮০ হাজার ৭৫২ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে ছাত্র ৯২ হাজার ৫৭২ জন এবং ছাত্রী ৮৮ হাজার ১৮০ জন। মোট উত্তীর্ণ হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৯২৫ জন।

ছাত্রীদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৫৫ হাজার ৫৫৮ জন। তাদের পাসের হার ৬৩ দশমিক ০১ শতাংশ। অন্যদিকে ছাত্রদের মধ্যে পাস করেছে ৪৯ হাজার ৩৬৭ জন, পাসের হার ৫৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হারে ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীরা প্রায় ৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ এগিয়ে রয়েছে।

জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও ছাত্রীদের অবস্থান এগিয়ে। এ বছর মোট ১৩ হাজার ৬৩৯ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। এর মধ্যে ছাত্রী ৭ হাজার ১৫২ জন এবং ছাত্র ৬ হাজার ৪৮৭ জন।

ফলাফলের সাত বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণেও পাসের হারে বড় ধরনের নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২০ সালে দিনাজপুর বোর্ডে পাসের হার ছিল ৮২ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ২০২১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৪ দশমিক ৮০ শতাংশে। ২০২২ সালে ৮১ দশমিক ১৬ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৭৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৭৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ৬৭ দশমিক ০৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করে। চলতি বছর সেই হার আরও কমে ৫৮ দশমিক ০৫ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ ২০২১ সালের তুলনায় ছয় বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৩৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

বিভাগভিত্তিক ফলাফলেও রয়েছে বড় পার্থক্য। বিজ্ঞান বিভাগে ৯৯ হাজার ৮১৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৭৩ হাজার ১৫৭ জন। এ বিভাগে পাসের হার ৭৩ দশমিক ২৯ শতাংশ।

মানবিক বিভাগের ফলাফল তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে হতাশাজনক। এ বিভাগে ৭৮ হাজার ৯৫৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ৩০ হাজার ৫৯৬ জন। পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৭৫ শতাংশে।

অন্যদিকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ১ হাজার ৯৭৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১ হাজার ১৭২ জন। এ বিভাগে পাসের হার ৫৯ দশমিক ২২ শতাংশ।

বোর্ডের ফলাফলে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এক বা দুটি বিষয়ে আটকে গেছে। এ বছর এক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে ৩৯ হাজার ৭৯৯ জন। দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে ১৭ হাজার ৬২০ জন। তিন বিষয়ে ৮ হাজার ৮৩০ জন এবং চার বিষয়ে ৪ হাজার ৮০৬ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে।

জেলাভিত্তিক ফলাফলেও পার্থক্য রয়েছে। পাসের হারে বোর্ডের আট জেলার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে রংপুর। এ জেলায় পাসের হার ৬২ দশমিক ৮৪ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ হাজার ৯৫৮ জন।

দিনাজপুর জেলায় পাসের হার ৫৯ দশমিক ২৯ শতাংশ। এ জেলা থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৫৮২ জন। নীলফামারীতে পাসের হার ৫৭ দশমিক ২০ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ হাজার ৬০১ জন।

কুড়িগ্রামে পাসের হার ৫৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এ জেলা থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ হাজার ১৭৯ জন। গাইবান্ধায় পাসের হার ৫৬ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ হাজার ৫৬০ জন।

লালমনিরহাটে পাসের হার ৫৬ দশমিক ০৯ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬২৬ জন। ঠাকুরগাঁওয়ে পাসের হার ৫৫ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ হাজার ৪৬৪ জন। সবচেয়ে কম পাসের হার পঞ্চগড়ে, ৫৫ দশমিক ২০ শতাংশ। এ জেলা থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬৬৯ জন।

প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফলেও এবার উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে। এ বছর দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের মাত্র ২৪টি বিদ্যালয়ের শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে। গত বছর শতভাগ পাস করা বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৪৮টি এবং ২০২৪ সালে ছিল ৭৭টি। অর্থাৎ শতভাগ পাস করা বিদ্যালয়ের সংখ্যাও ধারাবাহিকভাবে কমেছে।

অন্যদিকে এ বছর ১৮টি বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। গত বছর শূন্য পাস করা বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ১৩টি। ফলে শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এবার আরও বেড়েছে।

এবার এসএসসি পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে ১৫ জন পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

এবারের ফলাফলে একদিকে যেমন ছাত্রীদের ধারাবাহিক সাফল্য আরও স্পষ্ট হয়েছে, অন্যদিকে সামগ্রিক পাসের হার, মানবিক বিভাগের ফলাফল এবং শূন্য পাস করা বিদ্যালয়ের সংখ্যা শিক্ষা ব্যবস্থার মান ও প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে ২০২১ সালের তুলনায় পাসের হার প্রায় ৩৭ শতাংশ কমে যাওয়ায় দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল নিয়ে শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ড জানিয়েছে, প্রকাশিত ফলাফলে কোনো ধরনের ভুল, ত্রুটি বা অসঙ্গতি পাওয়া গেলে ফল প্রকাশের পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে লিখিতভাবে বোর্ড কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। নির্ধারিত সময়ের পর এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ বা জটিলতা তৈরি হলে তার দায় বোর্ড কর্তৃপক্ষ নেবে না।