ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রম কেবল যে আমাদের পেশি শক্তিশালী করে কিংবা হৃদযন্ত্রের যত্ন নেয় তা নয় বরং এটি আমাদের মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য রক্ষায় সবচেয়ে কার্যকর এবং শক্তিশালী হাতিয়ারগুলোর একটি। সম্প্রতি এক সোশ্যাল মিডিয়া বার্তায় এমনই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছেন বিশ্বখ্যাত কার্ডিওভাসকুলার সার্জন ড. জেরোমি লন্ডন। তার মতে, আমরা অনেকেই মানসিক বিষণ্নতা দূর করতে নানা উপায়ের খোঁজ করি, অথচ আমাদের হাতের কাছেই রয়েছে সবচেয়ে বিষণ্নতারোধী মাধ্যম; আর তা হলো সাধারণ শারীরিক ব্যায়াম। অ্যাথলেট হওয়ার মতো কঠিন পরিশ্রম না করেও কেবল দিনে ২০ মিনিটের একটি সাধারণ হাঁটাই মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।
ড. জেরোমি লন্ডন জানান, আমরা প্রায়শই মানসিক উদ্বেগে থাকলে একে অপরকে বলি ‘একটু হেঁটে এসো, মন ভালো লাগবে’। প্রচলিত এই কথার পেছনে রয়েছে গভীর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। অল্প সময়ের হাঁটাও তৎক্ষণাৎ মনকে শান্ত করতে সক্ষম। ব্যায়াম শুরু করার এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যেই শরীরে মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী হরমোন অর্থাৎ কর্টিসলের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। এটি আমাদের শরীরকে সার্বক্ষণিক ফাইট অর ফ্লাইট বা জরুরি উদ্বেগের অবস্থা থেকে বের করে আনে। কোনো নেতিবাচক চিন্তা নিয়ে বারবার মাথা ঘামানো বা ভাবনার ঘুরপাক থেকে বের হতেও হাঁটাহাঁটি দারুণ সাহায্য করে। বিশেষ করে সকাল বা দুপুরের রোদ গায়ে মেখে ২০ মিনিট বাইরে হাঁটলে তা শরীরের প্রাকৃতিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদমকে স্বাভাবিক রাখে, যা মেজাজ ভালো রাখতে সরাসরি ভূমিকা রাখে।
স্বল্পমেয়াদি এসব উপকারের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদেও ২০ মিনিটের মাঝারি গতির হাঁটা মস্তিষ্কের ওপর অভাবনীয় প্রভাব ফেলে। নিয়মিত এই অভ্যাসে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। এমনকি যারা খুব বেশি সময় পান না, তারা যদি দিনে মাত্র ১০ মিনিটও হাঁটেন, তাহলেও বিষণ্নতার ঝুঁকি ১৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এছাড়া নিয়মিত হাঁটাহাঁটি দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগজনিত মানসিক ব্যাধির ঝুঁকি প্রায় ২৯ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যায়ামের ফলে মস্তিষ্কে বিডিএনএফ এবং আইজিএফ-ওয়ান নামক রাসায়নিক উপাদানের নিঃসরণ বৃদ্ধি পায়। চিকিৎসকের ভাষায়, এই বিডিএনএফ হলো মস্তিষ্কের কোষের জন্য এক প্রকার সারের মতো। এটি মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর পারস্পরিক সংযোগ বৃদ্ধি করে এবং নতুন কোষের বিকাশে সাহায্য করে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে অ্যালঝেইমার ও পারকিনসন্সের মতো জটিল স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।
সুদীর্ঘ ২৫ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ পুনর্ব্যক্ত করেন যে, স্বাস্থ্যকর জীবনের জন্য শুরুটা শূন্য থেকে যেকোনো ইতিবাচক পদক্ষেপে নিয়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে বড় অর্জন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, ব্যায়াম অবশ্যই পেশাদার মানসিক চিকিৎসকের বিকল্প নয়, তবে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে শারীরিক নড়াচড়া এক অনন্য অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে যে দিনগুলোতে একদমই শারীরিক পরিশ্রম করতে ইচ্ছে করে না, সেদিনই মূলত মস্তিষ্কের এই হাঁটার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি থাকে। কোনো কঠিন জিম ওয়ার্কআউট বা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দৌড়ানোর প্রয়োজন নেই, কেবল ২০ মিনিট খোলামেলা পরিবেশে হাঁটাই একজন মানুষের মস্তিষ্ক ও মনের সার্বিক স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস





