মার্কিনিদের জন্য বেদনাদায়ক করতে যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত করতে চায় ইরান

ইরান যুদ্ধকে আরও দীর্ঘায়িত করার কৌশল নিয়েছে বলে মনে করছেন যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (আরইউএসআই) জ্যেষ্ঠ সহযোগী ফেলো মাইকেল স্টিফেন্স।

তার মতে, ইরানের ধারণা- বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ দেশটির সরকার টিকে থাকার জন্য অস্তিত্বের সংকট তৈরি করছে না। ফলে যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও তত বেশি চাপ তৈরি করা সম্ভব হবে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্টিফেন্স বলেন, যুদ্ধ শুরুর প্রায় ছয় মাস পর ইরান এখন অনেকটাই নিশ্চিত যে, যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে স্থল অভিযান চালাতে যাচ্ছে না। ফলে তেহরানের ওপর সরাসরি অস্তিত্বগত হুমকি আপাতত কমে গেছে।

তিনি বলেন, “সেই অস্তিত্বগত হুমকি এখন আর নেই। তাই তারা যুদ্ধের গতি বাড়াতে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য পরিস্থিতিকে আরও কিছুটা যন্ত্রণাদায়ক করে তুলতে চাইতে পারে। আর সেটি করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করা।”

স্টিফেন্সের মতে, ইরানের বর্তমান কৌশলের মূল লক্ষ্য শুধু সামরিকভাবে লড়াই চালিয়ে যাওয়া নয়; বরং যুদ্ধকে এমন এক অচলাবস্থায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রও দ্রুত কোনও সিদ্ধান্তমূলক ফলাফল অর্জন করতে পারবে না।

সরকার পতনের আশঙ্কা এখন আর বাস্তবসম্মত নয়
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর আগে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, নাগরিক অসহযোগিতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ইরানের সরকার দ্রুত ভেঙে পড়তে পারে।

বিশেষ করে ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত বড় ধরনের বিক্ষোভ ও সরকারবিরোধী আন্দোলনের পর ইরানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। অনেক বিশ্লেষক মনে করেছিলেন, বাইরের সামরিক চাপ বাড়লে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ আরও তীব্র হয়ে সরকার পতনের পথ তৈরি হতে পারে।

কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর পরিস্থিতি সেই প্রত্যাশা অনুযায়ী এগোয়নি বলে মনে করছেন স্টিফেন্স।

তিনি বলেন, “এখন আর তেমনটা মনে হচ্ছে না। আর সরকারকে তাদের কাঙ্ক্ষিত পথে বাধ্য করার মতো যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আদৌ কোনও কার্যকর হাতিয়ার অবশিষ্ট আছে কি না, তা নিয়েও আমি নিশ্চিত নই।”

স্টিফেন্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান বর্তমানে এমন একটি পরিস্থিতিতে রয়েছে, যা দেশটির জন্য অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে ব্যয়বহুল হলেও সরকারকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক অস্তিত্বগত হুমকি তৈরি করছে না।

তিনি বলেন, “ইরানিরা এই মুহূর্তে এমন অচলাবস্থার মধ্যে টিকে থাকতে পারে। এতে তাদের কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু এটি অস্তিত্বের সংকট নয়। আর এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সমস্যাটা সেখানেই।”

অর্থাৎ, ওয়াশিংটন যদি দ্রুত যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করতে চায়, তাহলে তেহরান সেই চাপ সামলে দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার কৌশল নিতে পারে। এতে যুদ্ধের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ক্রমে বাড়তে পারে।

বিশ্লেষকের মতে, এ কারণেই ইরান যুদ্ধকে দ্রুত শেষ করার পরিবর্তে দীর্ঘায়িত করার দিকে বেশি মনোযোগ দিতে পারে। তেহরানের হিসাব হলো, সময় যত গড়াবে, যুদ্ধের খরচ ও রাজনৈতিক চাপ ততই যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাড়বে।

ফলে বর্তমান সংঘাত কেবল সামরিক শক্তির লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; বরং কে কতদিন পর্যন্ত অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ সহ্য করতে পারে- সেটিও যুদ্ধের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সূত্র: আল-জাজিরা