বাক্সবন্দি চিকিৎসা সরঞ্জাম হবে পুনর্বণ্টন

প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ছয় বছর আগে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং (এমআরআই) যন্ত্র স্থাপন করা হয়। কিন্তু পরীক্ষামূলকভাবে যন্ত্রটি চালু করা হলে উত্তপ্ত হয়ে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আর চালু করা হয়নি।

হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ এই যন্ত্র বন্ধ থাকায় রোগীরা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাঁদের বাড়তি টাকা খরচ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে এমআরআই পরীক্ষা করতে হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারও রাজস্ব হারাচ্ছে।

দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে বছরের পর বছর পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে ব্যয়বহুল চিকিৎসা সরঞ্জাম। সেবার পরিধি বাড়াতে এগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় হাসপাতালে পুনর্বণ্টন ও চালুর নির্দেশ দিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা-১ শাখা থেকে সম্প্রতি এ নির্দেশনা জারি করা হয়।

সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ১৯ জুলাই স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে চিঠি পাঠানো হয়। এতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে প্রতি ১৫ দিন পরপর অগ্রগতি প্রতিবেদন বিভাগে জমা দিতে বলা হয়েছে। আদেশে বলা হয়, গত ৯ জুনের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় সারা দেশের হাসপাতালে অব্যবহৃত চিকিৎসা সরঞ্জামের দ্রুত ব্যবহার নিশ্চিত করতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘দুর্বল পরিকল্পনার কারণে অনেক দামি চিকিৎসা সরঞ্জাম বছরের পর বছর অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। অপরিকল্পিত ক্রয় এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে সরকারের বিপুল অর্থের অপচয় হয়েছে।’ উদাহরণ হিসেবে তিনি আওয়ামী লীগের আমলে কেনা দুটি রেডিওথেরাপি মেশিনের কথা উল্লেখ করেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিটি মেশিনের দাম প্রায় ১১ কোটি টাকা হলেও ১৮ কোটি টাকায় কেনা হয়। যেখানে মেশিন বসানো হয়েছে সেখানে সেটি পরিচালনা করার মতো অবকাঠামোই ছিল না। প্রতিটি মেশিনে ৪-৬ কোটি টাকার লাভের জন্যই এগুলো কেনা হয়েছিল। একটি মেশিন এখন ফরিদপুরে এবং অন্যটি খুলনায় অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘একইভাবে হাসপাতালগুলোতে এক্স-রে মেশিন ও অন্যান্য সরঞ্জাম কেনা হয়েছে, কিন্তু সেগুলো চালানোর মতো দক্ষ টেকনিশিয়ান ছিল না। অনেক যন্ত্র বছরের পর বছর অব্যবহৃত অবস্থায় আছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এখন এগুলো ভাঙারি হিসেবে বিক্রি করা ছাড়া উপায় নেই।’ তাই অকেজো চিকিৎসা সরঞ্জাম পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান তিনি।

পিপিআরসির জরিপ : ৫২ শতাংশ ডায়াগনস্টিক যন্ত্র অব্যবহৃত

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, সরকারি হাসপাতালের এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রাফিসহ অনেক ডায়াগনস্টিক মেশিন অব্যবহৃত থাকায় রোগীরা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ‘বাংলাদেশের পাবলিক হেলথ সিস্টেমের ঘাটতি পূরণ : ইউনিভারসাল হেলথ কাভারেজ-সংগত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে ব্যয় দক্ষতার র‌্যাপিড ফ্যাসিলিটি-লেভেল অ্যাসেসমেন্ট’ শীর্ষক এ জরিপে আটটি বিভাগের দুটি সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান যাচাই করা হয়।

জরিপে দেখা গেছে, জরিপকৃত ৬৫ শতাংশ হাসপাতালে ডায়াগনস্টিক যন্ত্রপাতি থাকলেও মাত্র ২৫ শতাংশের ক্ষেত্রে রোগীরা নিয়মিতভাবে ওই সেবা পেয়েছেন। জরিপে আরও বলা হয়, গত এক বছরে ৫২ শতাংশ ডায়াগনস্টিক যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়েছিল। জেলা হাসপাতালগুলোতে ডায়াগনস্টিক যন্ত্রপাতির প্রাপ্যতা সবচেয়ে বেশি ছিল ৮৫ শতাংশ, কিন্তু মাত্র ৩ শতাংশ হাসপাতাল নিয়মিত সেবা দিতে পেরেছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ৪৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে যন্ত্রপাতি থাকলেও নিয়মিত সেবা দেওয়া হয়েছে মাত্র ১৭ শতাংশের ক্ষেত্রে। মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে যন্ত্রপাতির প্রাপ্যতা ছিল ৫৪ শতাংশ, অথচ একই সময়ে মাত্র ২৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান নিয়মিত ডায়াগনস্টিক সেবা দিয়েছে।