সাগরে ভেসে গেল স্বপ্ন, ১১ বাংলাদেশির সলিল সমাধি

ইউরোপের উন্নত জীবনের আশায় দালালের খপ্পরে পড়ে আবারও ভূমধ্যসাগরে ঝরল তাজা প্রাণ। লিবিয়া থেকে অবৈধভাবে সাগরপথে গ্রিসে যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে খাদ্যসংকট ও নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১১ বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী।

টানা ৯ দিন সাগরে ভেসে থাকা, চোখের সামনে সহযাত্রীদের মৃত্যু আর লাশ সাগরে ফেলে দেওয়ার সেই নারকীয় অভিজ্ঞতার গল্প উঠে এসেছে জীবিত উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের মুখে। ঠিক কী ঘটেছিল সাগরের বুকে সেই কালরাত্রিতে?

উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৩ আগস্ট রাতে ৪২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে নিয়ে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা লিবিয়ার তাবারুক উপকূল থেকে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হয়। এই নৌকার ৪২ জনের মধ্যে ৩৮ জনই ছিলেন বাংলাদেশি। কিন্তু যাত্রা শুরুর কিছুক্ষণ পরেই নৌকাটি পড়ে তীব্র ঝড়ের কবলে।

ঝড়ের তোড়ে নৌকায় থাকা খাবার ও পানির সমস্ত মজুত সাগরে ভেসে যায়। তবুও জীবন বাজি রেখে খাবার ও পানি ছাড়াই বিপজ্জনক যাত্রা অব্যাহত রাখেন তারা। গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছাতেই ঘটে চরম বিপর্যয় হঠাৎ অকেজো হয়ে যায় নৌকার ইঞ্জিন।

অকেজো ইঞ্জিন নিয়ে সাগরে ভাসতে থাকা সেই নৌকায় শুরু হয় বেঁচে থাকার চরম আকুতি। কোনো দালাল কিংবা উদ্ধারকারী দল এগিয়ে আসেনি। টানা ৯ দিন অনাহার আর তৃষ্ণায় একে একে চোখের সামনেই মারা যান ৯ জন বাংলাদেশি। পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়ালে স্বজনহারা সহযাত্রীরা বাধ্য হয়ে লাশগুলো সাগরে ফেলে দেন। পরে আরও দুজন মারা যান।

বাতাসের স্রোতে ভাসতে ভাসতে নৌকাটি মিসরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছালে মিসরীয় নিরাপত্তা বাহিনী তাদের উদ্ধার করে।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সুনামগঞ্জের আবদুল করিম জানান, দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে থাকার কারণে তাদের শরীরে পচন ধরে গেছে। আকুতি জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের বাঁচান, আমরা দেশে ফিরে যেতে চাই।

এদিকে দেশে থাকা আবদুল করিমের পরিবার এই মর্মান্তিক খবরের কিছুই জানত না। তাঁর স্বজনরা জানান, করিম সৌদি আরবে থাকতেন কিন্তু কীভাবে তিনি ইউরোপের উদ্দেশ্যে সাগরপথে পা বাড়ালেন, তা তারা জানতেন না।

বর্তমানে মিসরের নিরাপত্তা বাহিনী ৩০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে উদ্ধার করেছে, যার মধ্যে ১৮ জন বাংলাদেশি মারসা মাতরুহ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

মিসরের বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, তারা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। আহতরা সুস্থ হলে আইনি প্রক্রিয়া শেষে ট্রাভেল পারমিটের মাধ্যমে যত দ্রুত সম্ভব তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।