প্রকৃত অপরাধী নয়, টার্গেট ছিল বিএনপি

একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার মতো একটি ভয়াবহ ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত ও বিচারের পরিবর্তে বিএনপি এবং তার শীর্ষ নেতৃত্বকে রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করার চেষ্টা করা হয়েছে। আইনজীবীরা বলছেন, পুনরায় তদন্তের নামে প্রকৃত অপরাধীদের দিকে নজর না দিয়ে বিএনপিকে টার্গেট করা হয়েছে। বহুল আলোচিত এ মামলাটিতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ সব আসামিকে খালাস দিয়ে রায় দিয়েছেন হাই কোর্ট। পরে এই রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগও। হাই কোর্টের রায়ে তদন্ত ও বিচারের নানা ত্রুটি উঠে এসেছে। মামলাটি আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে।

আইনজীবীদের ভাষ্য, ঘটনার পর প্রথম দিকে তদন্ত একদিকে এগোলেও পরবর্তী সময়ে মামলার গতিপথ পরিবর্তিত হয়। তাঁরা বলেন, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করা হয় এবং বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা হয়। তাঁদের মতে, প্রকৃত অপরাধী শনাক্তের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দায়ী করার প্রবণতা তদন্তকে দুর্বল করে দেয়। ফলে মামলার মূল রহস্য উন্মোচনের পরিবর্তে তা রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে যায়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন এমপি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ২১ আগস্টের মতো একটি ঘটনায় জাতি প্রকৃত সত্য জানতে চেয়েছিল। কিন্তু মামলার তদন্ত এমনভাবে পরিচালিত হয়েছে যে শেষ পর্যন্ত আদালতই সেই তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

তিনি বলেন, দ্বিতীয় যে তদন্ত করা হয়েছে, সেটা করাই হয়েছে বিএনপিকে টার্গেট করে। ওই তদন্তে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির মাধ্যমে কয়েকজনের কাছ থেকে শুধু বিএনপির বিষয়ে সাক্ষ্য আদায় করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, একটি ফৌজদারি মামলার মূল উদ্দেশ্য হলো ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিত করা। কিন্তু ২১ আগস্ট মামলায় সেই লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ফলে মামলাটি শুরু থেকেই বিতর্কিত হয়ে ওঠে। তাঁদের মতে, তদন্তের বিভিন্ন ধাপে রাজনৈতিক প্রভাবের ছাপ স্পষ্ট ছিল।

প্রথম তদন্ত ও পরবর্তী তদন্তের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য, অভিযোগপত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এবং আসামির তালিকায় নাটকীয় রদবদল মামলাটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। পরবর্তী সময়ে আদালতের পর্যবেক্ষণেও এসব বিষয়ে নানা প্রশ্ন উঠে আসে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাই কোর্ট ও আপিল বিভাগে শুনানি করা আসামিপক্ষের আইনজীবী এস এম শাহজাহান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এই মামলায় তদন্তের ত্রুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ২০০৪ সালের ঘটনায় ২০০৮ সালে প্রথম যে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়, সেটা আদালত গ্রহণ করেন। এই অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে বিচার শুরুর পর ৬১ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। এর মধ্যে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ঘটে। এরপর মামলাটি আইনে না থাকলেও পুনরায় তদন্তে পাঠানো হয়।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর এমপি-মন্ত্রী অনেকেই সাক্ষী দিয়েছেন। কিন্তু কোনো সাক্ষীই কোনো অপরাধীকে চোখে দেখার কথা বলেননি। মামলাটিতে কোনো প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী বা পারিপাশির্^ক প্রমাণ ছিল না। শুধু কয়েকজন আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করেই রায় দিয়েছেন বিচারিক আদালত। তিনি আরও বলেন, বিচার বিচারের গতিতে প্রবাহিত হওয়া উচিত। যদি শাসক-সরকার বিচারকে প্রভাবিত করতে যায়, তাহলে বিচার এমনই হয়। সঠিক তদন্ত না হলে, সঠিক বিচার হবে না, এই মামলাটি একটি নজির।

যে কারণে টেকেনি সাজা : হাই কোর্টের রায়ে মামলার সাক্ষ্যপ্রমাণ ও আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, যেসব পরিস্থিতিতে কয়েকজন আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়েছিল, তা কতটা স্বতঃস্ফূর্ত ছিল, সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে।

রায়ে হাই কোর্ট বলেন, কথিত মূল পরিকল্পনাকারী মুফতি আবদুল হান্নান প্রথম স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার চার বছর পর দ্বিতীয় জবানবন্দি দেন। দ্বিতীয় জবানবন্দির আগে তিনি দীর্ঘ সময় কারাগারের কনডেমড সেলে ছিলেন। অন্য আসামিরাও দীর্ঘ সময় পুলিশি হেফাজতে থাকার পর ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জবানবন্দি দেন। কয়েকজন আসামি পরে তাঁদের স্বীকারোক্তি প্রত্যাহারের আবেদনও করেছিলেন। হাই কোর্ট আরও বলেন, তিন আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি একজন ম্যাজিস্ট্রেট এক দিনে অস্বাভাবিক দ্রুততায় রেকর্ড করেন, যা সংশ্লিষ্ট নিয়মের গুরুতর লঙ্ঘন। ফলে এসব স্বীকারোক্তিকে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে গ্রহণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যায়।

এ ছাড়া মামলার কথিত মূল পরিকল্পনাকারী মুফতি আবদুল হান্নানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় তাঁকে স্বীকারোক্তির বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি বলেও উচ্চ আদালতের রায়ে উল্লেখ করা হয়। আদালতের মতে, এ কারণে স্বীকারোক্তিগুলো নির্ভরযোগ্যতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়নি। প্রসঙ্গত ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বর্তমানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে গ্রেনেড হামলায় ২৪ ব্যক্তি নিহত হন।