পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের রাজনীতিতে এক নতুন মেরূকরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের পুরোনো রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ পাল্টে জামায়াতে ইসলামী তাদের কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে।
মাঠের রাজনীতিতে দৃশ্যমান কোনো সংঘাত বা সরাসরি সংঘর্ষে না জড়িয়ে, সুকৌশলে বিভিন্ন স্পর্শকাতর ও জাতীয় ইস্যু সামনে এনে বর্তমান সরকারকে রাজনৈতিক মাঠে চাপে রাখার নীতি গ্রহণ করেছে দলটি।
বিশেষ করে রাষ্ট্র সংস্কারের নানা রূপরেখা, নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক এবং সরকারের বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনার মাধ্যমে জামায়াত নিজেদের স্বাধীন রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার পাশাপাশি মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের অনুকূলে রাখতে চাইছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের এই নীরব অথচ কঠোর মনস্তাত্ত্বিক কৌশল কেবল সরকারের নীতিনির্ধারকদেরই ভাবিয়ে তুলছে না, বরং বিএনপির মতো প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরেও এক ধরনের সতর্ক অবস্থান তৈরি করেছে।
জামায়াতের কৌশল ও বিএনপির ভাবনা : জামায়াতে ইসলামী বর্তমান সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের নিয়মিত ও কঠোর সমালোচনা করছে। সরকারের নানা ত্রুটি ও ব্যর্থতাগুলোকে জনসমক্ষে জোরালোভাবে হাজির করে তারা নিজেদের একটি বিকল্প ও কার্যকর শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে।
সংস্কার ও নির্বাচনি পদ্ধতি নিয়ে চাপ সৃষ্টি : আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক (পিআর) নির্বাচনব্যবস্থা এবং বিভিন্ন কাঠামোগত সংস্কারের প্রস্তাব সামনে এনে তারা সরকারকে আইনি ও রাজনৈতিক উভয় সংকটে ফেলার সুদূরপ্রসারী কৌশল নিয়েছে।
স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তা প্রকাশ : অতীতে বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘ জোটবদ্ধ ও যুগপৎ রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও, বর্তমান সময়ে জামায়াত নিজেদের একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রমাণ করতে সচেষ্ট রয়েছে, যা মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোকে নতুন সমীকরণের মুখে ফেলছে।
ধারাবাহিক কর্মসূচি ও রাজপথের উপস্থিতি : সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, গণমিছিল ও বিভিন্ন ঘরোয়া সভার পাশাপাশি বড় জমায়েতের মতো ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা করে তারা রাজনৈতিক মাঠ সবসময় গরম রাখার চেষ্টা করছে।
জনরোষ ও লংমার্চ হুঁশিয়ারি : সরকারের কোনো কোনো সিদ্ধান্ত বা কার্যক্রমে জনস্বার্থের ঘাটতি রয়েছে দাবি করে, ভবিষ্যতে বৃহত্তর আন্দোলনের মাধ্যমে তীব্র জনরোষ তৈরি করার প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে রাখছে দলটি।
মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত দূরত্ব বজায় রাখা : সরাসরি বড় কোনো সংঘাতে জড়িয়ে নিজেদের মাঠছাড়া না করে, অত্যন্ত সুকৌশলে রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করাই বর্তমান জামায়াতের প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জামায়াতের এই কৌশলগত অবস্থান এবং সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির অপচেষ্টা প্রসঙ্গে বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
জামায়াতের ষড়যন্ত্র গণতান্ত্রিক উপায়েই মোকাবিলা করবে বিএনপি : জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জামায়াতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও তাদের ঐতিহাসিক ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করে জানিয়েছেন, একাত্তরের ভূমিকা এবং সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক আচরণ দেশের সাধারণ মানুষ কখনোই সহজভাবে নেয়নি।
তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের অন্যায্য, অযৌক্তিক চাপ বা পর্দার আড়ালের ষড়যন্ত্রমূলক কার্যক্রম গণতান্ত্রিক উপায়েই মোকাবিলা করবে বিএনপি। বিএনপি কোনো বিশেষ দলকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে দেশের মূল গণতান্ত্রিক যাত্রাকে কোনোভাবেই ব্যাহত হতে দেবে না। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে নস্যাৎ করার যেকোনো চক্রান্ত রাজপথেই প্রতিহত করা হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
জামায়াতের অপচেষ্টা জনগণ সম্মিলিতভাবে প্রতিহত করবে : বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, দেশের মানুষ দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী লড়াই ও ত্যাগের পর একটি সুস্থ ধারার এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ পুনরায় ফিরে পেয়েছে। এই ক্রান্তিকালে কোনো গোষ্ঠী বা দল যদি সংকীর্ণ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির অপচেষ্টা চালায়, তবে দেশের সাধারণ জনগণ তা সম্মিলিতভাবে প্রতিহত করবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রাজপথে লড়াই করে আসছে এবং ভবিষ্যতেও জনগণের অকৃত্রিম আস্থাকে সঙ্গে নিয়েই দেশ পরিচালনা ও যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করবে।
অপরদিকে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক প্রভাবশালী সদস্য মির্জা আব্বাসসহ দলের অন্যান্য নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, জামায়াতের বর্তমান রাজনৈতিক কৌশল মূলত বর্তমান সরকারের মনোযোগ ভিন্ন খাতে নেওয়ার একটি রাজনৈতিক কৌশল বা অপচেষ্টা মাত্র। অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক জোটে থেকে কিংবা বর্তমান সময়ে এককভাবে যারা ফ্যাসিবাদী বা অগণতান্ত্রিক শক্তিকে পরোক্ষভাবে উসকে দিতে চায়, তাদের সেই গোপন রাজনৈতিক অভিসন্ধি কখনো সফল হতে দেবে না বিএনপি।
দলটির নীতিনির্ধারক মহলের মতে, জামায়াত যেসব ইস্যু নিয়ে মাঠ গরম করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, সেগুলোর বেশির ভাগই জনসমর্থনহীন এবং তা কেবল নিজেদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের একটি ব্যর্থ কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়।
যেভাবে দূরত্ব সৃষ্টি জামায়াত-বিএনপির : ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে মাঠের রাজনীতি ও ক্ষমতার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার দূরত্ব ও দ্বন্দ্ব স্পষ্ট রূপ নেয় এবং তা বিএনপি সরকার গঠনের পর বাড়তে থাকে।
বিএনপির চিন্তা ও বক্তব্য আদর্শগত : বিএনপির নীতিনির্ধারক ও শীর্ষ নেতাদের মতে, জামায়াতের সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক কৌশল ও আদর্শের পার্থক্য স্থায়ী। বিগত দিনে যৌথ আন্দোলন করলেও রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা ও নীতি নিয়ে দুই দলের অবস্থান সম্পূর্ণ আলাদা।
অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযোগ : বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা ও সরকারের নীতিনির্ধারকরা অভিযোগ করছেন, জামায়াত ও তাদের সমমনা জোট রাজপথে বিভিন্ন কর্মসূচি বা লংমার্চের নামে দেশে অপ্রয়োজনীয় অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে।
গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা : বিএনপি নিজেদের একটি উদার ও মধ্যপন্থি দল হিসেবে তুলে ধরে এককভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা ও নির্বাচন প্রক্রিয়ায় এগোতে চায়। তারা মনে করে মাঠের রাজনীতিতে উগ্র বা সংঘাতমূলক পথ পরিহার করে সংসদীয় ও সাংবিধানিক ধারায় চলা উচিত।
বন্ধুত্ব থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা : রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এক সময়ে দীর্ঘদিনের নির্বাচনি মিত্র থাকলেও আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতির কারণে এখন বিএনপি ও জামায়াত সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। মাঠের রাজনীতিতে একক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চাওয়াই এই দ্বন্দ্বের মূল কারণ।
সংঘাতের আশঙ্কা : অনেক বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছেন, দুই দল যদি নিজেদের বিপরীত অবস্থান থেকে সরে না আসে এবং সংলাপ বা সমঝোতার পথ না ধরে, তবে এই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা দীর্ঘমেয়াদে মাঠে বড় ধরনের সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, লংমার্চের মাধ্যমে সরকার পতন বা তাদের বিপদে ফেলার কোনো উদ্দেশ্য ১১ দলের নেই। আমরা জনগণের ন্যায্য দাবি আদায়ে রাজপথে নেমেছি। গণভোটের গণরায় মেনে নেওয়া, আইনশৃঙ্খলা, জনদুর্ভোগ, সার, বিদ্যুৎ, দুর্নীতি ও দলীয়করণসহ ছয় দফা দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই আন্দোলন।
তিনি বলেন, পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসি যেসব দেশে আছে, বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি হচ্ছে গণতন্ত্রের একটা চর্চা, একটা সৌন্দর্য।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে গোপালগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক মো. সেলিমুজ্জামান মোল্যা (সেলিমুজ্জামান সেলিম) বলেন, জামায়াতের তো আর সরকার গঠনের শক্তি নেই, তারপরও তারা দেশ নিয়ে ষড়যন্ত্র করতে পারে এটা স্বাভাবিক। তবে বিএনপি এসব নিয়ে সতর্ক রয়েছে। জামায়াতের ষড়যন্ত্র গণতান্ত্রিকভাবেই মোকাবিলা করবে বিএনপি।





