চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে গত সাড়ে পাঁচ মাসে দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৮৯১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নিশ্চিত হামে মারা গেছে ১০০ শিশু। সব মিলিয়ে হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত হামে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৯১।
মাত্র সাড়ে পাঁচ মাসের ব্যবধানে এত শিশুর মৃত্যু দেশে আর কোনো রোগে হওয়ার রেকর্ড নেই বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা। শুধু তাই নয়, এত অল্প সময়ের ব্যবধানে হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ২ লাখ শিশু, যা দেশের ইতিহাসে কখনো হয়নি বলে মত তাদের।
গতকাল শনিবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এক দিনে হামে মারা গেছে চার শিশু। এদের মধ্যে উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে তিন শিশু ও নিশ্চিত হামে মারা গেছে এক শিশু। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে মোট ৮৯১ শিশুর।
আর হামে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছে ১০০ শিশু। অর্থাৎ, হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়ার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৯১। এ ছাড়া, ২৪ ঘণ্টায় ৭৪ শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে, আর হামের উপসর্গজনিত রোগীর সংখ্যা ৮৪৩। এই সময়ে ৭৬১ শিশু নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, আর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ৫৭১ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত মোট সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৬৩ হাজার ১০৫ আর নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ১৯ হাজার ৬৪১। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে মোট ১ লাখ ৪৩ হাজার ২১৪ রোগী, যাদের মধ্যে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৯২১ জন ছাড়পত্র পেয়ে এরই মধ্যে বাড়ি ফিরেছে।
এমন পরিস্থিতিতে যেকোনো ধরনের জ¦র উঠলেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. তুষার মাহমুদ বলেন, করোনার সময় আমরা যেমনটা দেখেছি সরকারের পক্ষ থেকে সংক্রমণ রোধে প্রচারণা জোরদার ছিল। কিন্তু হামের ক্ষেত্রে এমনটা দেখা যাচ্ছে না।
যদিও সরকার অতি দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে এবং একটা বড় অংশ শিশু টিকার আওতায়ও এসেছে, কিন্তু জ¦র উঠলেই যে শিশু বা বয়স্ক যে কাউকেই আইসোলেটেড করে নিতে হবে, সেটা ঢালাওভাবে প্রচার করা হচ্ছে না। হাম অতি সংক্রমাক একটি রোগ। কোনো বাড়িতে এক শিশুর হাম হলে যদি তাকে সঙ্গে সঙ্গে আইসোলেশনে নেওয়া না হয়, তাহলে তা অন্য শিশুতে ছড়িয়ে যাবে।
শুধু তাই নয়, ওই শিশু থেকে একটা পুরো গ্রাম পর্যন্ত সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। যেহেতু টিকার ফলাফল এখনো দেখা যাচ্ছে না, সেহেতু নিজেদের সতর্কতা অত্যন্ত জরুরি। এখন ডেঙ্গুর সময়ও। তাই জ¦র ওঠার সঙ্গে সঙ্গে হাম না ডেঙ্গু, তা নিশ্চিত হতে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। নইলে মহামারি রোধ করা অসম্ভব।
এত অল্প সময়ের ব্যবধানে হামের এই তীব্রতার কারণ বিগত বছরগুলোতে টিকাদানে অবহেলা উল্লেখ করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেনিন চৌধুরী বলেন, ‘আমরা এত দিন দেখেছি এর মাধ্যমে খাদ্য-পুষ্টি, শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য, সংক্রামক-অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, টিকাদানসহ স্বাস্থ্যের বিভিন্ন খাতে অর্থ বরাদ্দ, কেনাকাটা, জনবল নিয়োগসহ যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো।
সেক্টর প্রোগ্রামের শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য কার্যক্রমের আওতায় এত দিন সারা দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) পরিচালিত হতো। এ ক্ষেত্রে টিকার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব সংস্থা গ্যাভির আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশ এত দিন টিকা কিনত ইউনিসেফের মাধ্যমে।
এতে টিকা কিনতে সরকারকে খুব একটা বেগ পেতে হতো না এবং সময়ও তুলনামূলকভাবে কম লাগত। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার অতি মাতবরি করতে গিয়ে এই কার্যক্রম বাতিল করে দিয়ে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনা কর্মসূচির পরিকল্পনা নেয়, যা বাস্তবায়ন তো করেইনি বরং উল্টো সব ঘেঁটে দিয়ে গেছে, যার ফল ভোগ করতে হচ্ছে এখন কোমলমতি শিশুপ্রাণকে।
যদিও বর্তমান সরকার টিকাদান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু মহামারির তীব্রতা এতই ছড়িয়ে পড়েছে যে টিকাও কোনো কাজ করছে না। এই টিকা কেন কাজ করছে না, তা-ও খতিয়ে দেখতে হবে বলে মন্তব করেন তিনি।





