হরমুজ প্রণালি বন্ধের প্রথম চার মাসে বাংলাদেশের ক্ষতির পরিমাণ ১৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। জুনে শেষ হয়েছে প্রথম চার মাস। তারপর কেটে গেছে আরও দুই মাস। এ হিসাবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ক্ষতি হয়েছে অন্তত ২৮ হাজার কোটি টাকা। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনে সরকারের দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে হরমুজ প্রণালি। বিশেষ করে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্য আমদানি, শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ এবং পণ্য পরিবহনে ব্যাঘাতের কারণে বাড়ছে অর্থনৈতিক চাপ। সামনে পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে কী ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে দেশ, তা নিরূপণে তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
দুশ্চিন্তার বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। গতকাল তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। এ ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে সরকার সব ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু যারা এটার জন্য দায়ী তারা যদি নমনীয় না হয় তাহলে আমাদের মতো দেশের করার তেমন কিছু থাকে না’। তবে সরকার কী কী উদ্যোগ নিয়েছে সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।
এদিকে, অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ায় সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নিতে চাইছে সরকার। এ জন্য গত ১ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পশ্চিম ইউরোপ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন শাখা থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আগামী ৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হলে সম্ভাব্য ক্ষতি এবং তা মোকাবিলায় করণীয় সম্পর্কে মতামত ও সুপারিশ পাঠাতে বলা হয়েছে।
চিঠিটি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, অর্থ বিভাগ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ফলে স্পষ্ট, সরকার বিষয়টিকে শুধু জ্বালানি সরবরাহের সংকট হিসেবে দেখছে না; আমদানি-রপ্তানি, পরিবহন, বৈদেশিক মুদ্রা, শিল্প উৎপাদন এবং মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের ঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
চার মাসে ক্ষতি ১৮ হাজার ৭০০ কোটি : মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অভিঘাত ইতোমধ্যে দেশের জ্বালানি খাতে দৃশ্যমান। মার্চ থেকে জুন-চার মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম, পরিবহন ও বিমা ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকারের কাছে ভর্তুকি চেয়েছে সংস্থাটি।
এর বাইরে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার খাতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অতিরিক্ত প্রায় ৪২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এর মধ্যে তেলে ১০ হাজার ২৫৮ কোটি, গ্যাসে ১১ হাজার ১৭০ কোটি, বিদ্যুতে ১৯ হাজার ৮২১ কোটি এবং সারে ১ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
এলএনজিতে বাড়তি চাপ : হরমুজ সংকটের বড় ধাক্কা এসেছে এলএনজিতে। দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহে ব্যাঘাতের কারণে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এতে এলএনজি ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা ৬ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ১৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় উঠেছে। অর্থাৎ এ খাতেই বাড়তি চাপ প্রায় ১০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
আগামী মাসের সরবরাহের জন্য প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ২৪ ডলারের বেশি পড়ছে। যুদ্ধের আগে স্পট মার্কেটে এ দাম সাধারণত ১০ থেকে ১২ ডলারের মধ্যে ছিল। হরমুজে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে পরিবহন, ফ্রেইট ও বিমা ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাড়বে ডলারের চাহিদা : বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য হরমুজ সংকটের বড় ঝুঁকি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ। জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বাড়ার পাশাপাশি বিকল্প দীর্ঘ রুটে জাহাজ চলাচল করলে বাড়বে পরিবহন ব্যয়। একই সঙ্গে যুদ্ধঝুঁকির কারণে বাড়তে পারে বিমা প্রিমিয়াম। জ্বালানি মজুত বাড়াতে অতিরিক্ত ৪ লাখ ৮০ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানির সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ৭ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা। অতিরিক্ত আমদানি ব্যয় ডলারের চাহিদা বাড়াবে এবং আমদানি বিলও বৃদ্ধি পাবে। ফলে টাকার বিনিময়মূল্য ও মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
শিল্পে মন্দার আশঙ্কা : হরমুজে দীর্ঘ সময় জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকলে শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও মধ্যবর্তী পণ্য আমদানিতে সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়বে। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় যুক্ত হয়ে শিল্পপণ্যের দাম বাড়তে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পে এর প্রভাব বড় হতে পারে। কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি পণ্য সময়মতো পাঠানো কঠিন হতে পারে। সমুদ্রপথে পরিবহন ব্যয় বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও কমবে।
রেমিট্যান্সেও ঝুঁকি : মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে নতুন কর্মী যাওয়া, বিমান চলাচল ও শ্রমবাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। এতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ কমার পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সংকট তীব্র হওয়ার আগেই প্রস্তুতি : তথ্য অনুযায়ী, ৩ সেপ্টেম্বর হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র চারটি বাণিজ্যিক জাহাজ অতিক্রম করেছে। আগের ১০ দিনে দৈনিক গড় ছিল ১৫টি। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ১২৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ এ পথ ব্যবহার করত। বিশ্বের তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের সঙ্গে যুক্ত এ প্রণালি। ইতোমধ্যে হরমুজ খুলে গেলে বাংলাদেশে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এলএনজি সরবরাহের জন্য কাতারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে সরকার। তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
তিন চ্যালেঞ্জ : বাংলাদেশের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ তিনটি-জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বাড়তি আমদানি ব্যয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ডলার জোগান দেওয়া এবং মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা। হরমুজ সংকট তাই এখন আর শুধু ভূরাজনৈতিক উদ্বেগ নয়; এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রার বাজার, শিল্প উৎপাদন ও মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত অর্থনৈতিক ঝুঁকি।
বিশেষজ্ঞ মতামত : এফবিসিসিআইর প্রশাসক মো. ফজলুর রহমান বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি আমদানি স্বাভাবিক রাখা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে শুধু জ্বালানি খাত নয়, এর প্রভাব পুরো বেসরকারি খাতের ওপর পড়বে। অবশ্য তা ইতোমধ্যে পড়ছে। আমদানি ব্যয়, পরিবহন ব্যয় ও উৎপাদন ব্যয় বাড়লে ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে। তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন। অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো সামনে নিয়ে এসেছে। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা হলে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতিও বাড়তে পারে। জ্বালানি খাতে আমদানি নির্ভরতা কমাতে হবে। নিজেদের জ্বালানি উৎপাদন বাড়াতে হবে।





