বিশ্বের ভয়াবহতম হাম প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশে

একসময় হাম নির্মূলের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি। চলতি বছরের মার্চ থেকে গত ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত হাম-সংক্রমণে ৯৯৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হয়েছে ১৯ হাজার ৮৩৫ জনের। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি রোগী।

গতকাল বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানায় বার্তা সংস্থা রয়টার্স। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) ওয়েবসাইটের তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাব চলছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাত, টিকার সরবরাহে সমস্যা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়। এতে তৈরি হয়েছে ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’, যা হাম ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। বিশেষ করে নিয়মিত টিকা নেওয়ার বয়স না হওয়া ৯ মাসের কম বয়সি শিশুরাই বেশি সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়েছে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রাদুর্ভাব শুরুর পর হাম ও হামের উপসর্গে ৯৯৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১০০ শিশুর মৃত্যু হামেই হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বাকিরা হাম উপসর্গে মারা গেছে। এ ছাড়া প্রাদুর্ভাবের শুরুতে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন গত সোমবার সংসদে বলেন, টিকা কেনার নীতিতে পরিবর্তনের কারণে টিকার সংকট তৈরি হয়েছিল। ২০২৪ সালে একটি টিকাদান কর্মসূচি স্থগিত এবং পরের বছর দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি বাতিল হওয়ায় অনেক শিশু সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে।

এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থা নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ব্যাঘাতের বিষয়টি তুলে ধরেছে।

মহামারিবিদ এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টিকাদান ঘাটতির কারণে বাংলাদেশ হাম নির্মূলের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। তার ভাষায়, এত বেশি শিশুর হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু এবং এক বছরে এত রোগী এর আগে বাংলাদেশ দেখেনি। পরিস্থিতি ‘ভয়াবহ’ উল্লেখ করে তিনি দ্রুত টিকাদানের ঘাটতি পূরণ, টিকার আওতা বাড়ানো এবং জনসচেতনতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

এদিকে হাম প্রাদুর্ভাবের পাশাপাশি ডেঙ্গু পরিস্থিতিও হাসপাতালগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ডেঙ্গুতে ৪৫ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। গত মঙ্গলবার ডেঙ্গুতে ৯ জনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ৫৭১ জনের হাসপাতালে ভর্তিÑ দুটিই চলতি বছর এক দিনে সর্বোচ্চ।

ঢাকার শহিদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দদুলাল সাহা বলেন, রোগীর চাপ এত বেশি যে, সবাইকে জায়গা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। হাসপাতালটিতে হাম রোগীদের জন্য ৬০টি শয্যা থাকলেও অনেক রোগীকে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় স্যালাইনের সংকটও পরিস্থিতিকে জটিল করছে। ১ হাজার ৩৫০ রোগীর ধারণক্ষমতার হাসপাতালটিতে বর্তমানে ২ হাজার ৩৫০ জনের বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে আক্রান্ত শিশুদের স্বজনদের দুর্ভোগও তুলে ধরা হয়েছে। ঢাকার ৩৫ বছর বয়সি গৃহকর্মী নাসিমা বেগম জানান, তার ১৩ মাস বয়সি ছেলে প্রায় দুই মাস আগে হামে আক্রান্ত হয়। চারটি হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে পরে একটি হাসপাতালে ভর্তি করাতে সক্ষম হন। ১০ দিন পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেও শিশুটির বারবার জ্বর আসছে। অসুস্থ থাকায় সে সময়মতো টিকা নিতে পারেনি। পরে টিকাকেন্দ্রে গেলে টিকা পাওয়া যায়নি। তবে তার অন্য চার সন্তান নিয়মিত টিকা পেয়েছে।

কারখানা শ্রমিক মোহাম্মদ রিপনের আট মাস বয়সি মেয়েও হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার কয়েক দিন পর হাম উপসর্গে আক্রান্ত হয়। কিন্তু একাধিক হাসপাতালে ঘুরেও মেয়ের রোগ সম্পর্কে তিনি কোনো সঠিক তথ্য পাননি। শেষ পর্যন্ত বিশেষায়িত হাম হাসপাতালে মেয়ের চিকিৎসা করাতে হয় তাকে।

হাম-রুবেলার জরুরি টিকাদান কর্মসূচিতে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সি প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল বাংলাদেশ সরকার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুসারে, পরবর্তীকালে ১ কোটি ৯৭ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জরুরি কর্মসূচির পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান জোরদার এবং বাদ পড়া শিশুদের জন্য ‘ক্যাচ-আপ’ কর্মসূচি চালানো জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক হলেও দুই ডোজ টিকার মাধ্যমে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই চলমান সংকট শুধু চিকিৎসার মাধ্যমে মোকাবিলা নয়, একই সঙ্গে নিয়মিত টিকাদানের ঘাটতি পূরণ এবং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করার বিষয়টিকে সামনে এনেছে।