যুদ্ধ ও বাণিজ্য উত্তেজনার ছায়ায় ভারতে শি জিনপিং, শুরু হচ্ছে ব্রিকস সম্মেলন

যুদ্ধ, বাণিজ্যিক অস্থিরতা ও জ্বালানি নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ইস্যুতে বিভক্তির মধ্যেই ভারতের নয়াদিল্লিতে শুরু হচ্ছে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন।

সম্মেলনে অংশ নিতে শনিবার ভারতে পৌঁছেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। রাশিয়া ও ইরানের প্রেসিডেন্টসহ ব্রিকসের ১১ সদস্য দেশের নেতাদের উপস্থিতিতে দুই দিনের এ সম্মেলনে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের যুদ্ধ, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি নিরাপত্তা গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে সম্মেলনে যোগ দিতে শনিবার চীন ছাড়েন শি জিনপিং। চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, তার সফরসঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির উচ্চপর্যায়ের নেতা ছাই কি।

ভারতে শি জিনপিংয়ের এবারের সফর বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৯ সালের পর এই প্রথম তিনি ভারত সফর করছেন। ফলে পারমাণবিক শক্তিধর দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও চীনের মধ্যকার সম্পর্কের সাম্প্রতিক সতর্ক উষ্ণতার সবচেয়ে বড় অগ্রগতি হিসেবে তার এই সফরকে দেখা হচ্ছে।

সীমান্ত সংঘাতের পর সম্পর্কের বরফ গলছে
শি জিনপিংয়ের সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন ভারত ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা কিছুটা কমার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ২০২০ সালে বিতর্কিত তিব্বত সীমান্তে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি হয়েছিল।

সেই সংঘাতের ছয় বছর পর ধীরে ধীরে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ছে। বিমান চলাচল পুনরায় চালু, ভিসা কার্যক্রমে অগ্রগতি এবং উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
তবে দুই দেশের মৌলিক বিরোধ এখনও মীমাংসিত হয়নি। তিব্বতসংলগ্ন প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পার্বত্য সীমান্তে ভারত ও চীন এখনও বিপুলসংখ্যক সেনা মোতায়েন রেখেছে। সীমান্ত বিরোধের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি এবং কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতাও সম্পর্ককে জটিল করে রেখেছে।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুক্রবার জানিয়েছে, ভারত ও চীন ‘যোগাযোগ জোরদার, সহযোগিতা বাড়ানো এবং মতপার্থক্য যথাযথভাবে মোকাবিলার’ মাধ্যমে একসঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শনিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে শি জিনপিংয়ের সরাসরি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের চীন-ভারত সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্রদীপ তানেজার মতে, সীমান্ত ইস্যুতে দুই দেশ দ্রুত ও বাস্তব অগ্রগতি চায়। তার ভাষ্য, সীমান্তে বিপুলসংখ্যক সেনা মোতায়েন রেখে একই সঙ্গে মানুষে-মানুষে যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানোর কথা বলা কঠিন।

অবিশ্বাস এখনও বড় বাধা
সম্পর্কের উন্নতির কিছু লক্ষণ দেখা গেলেও ভারত ও চীনের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস এখনও রয়ে গেছে। হিমালয় সীমান্তের বিরোধ, চীনের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি এবং এশিয়ায় দুই দেশের কৌশলগত প্রতিযোগিতা সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে বড় বাধা হয়ে আছে।

শি জিনপিংয়ের ভারত সফরের বিরোধিতা করে শুক্রবার নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভ করেছেন নির্বাসিত তিব্বতীয়রা। তাদের মধ্যে ছিলেন তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামার অনুসারীরাও। বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে চীনা প্রেসিডেন্টের সফরের প্রতিবাদ জানান।

রাশিয়া ও ইরানের নেতারাও নয়াদিল্লিতে
ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও শুক্রবার নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শুক্রবার বৈঠক করেছেন পুতিন। বৈঠকে দুই নেতা ভারত ও রাশিয়ার মধ্যকার ‘বিশেষ’ সম্পর্ক আরও জোরদারের বিষয়ে একমত হয়েছেন।

অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সমুদ্রপথে অবাধ নৌচলাচল ও বাণিজ্যের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। পাশাপাশি জাহাজের নাবিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধেও ব্রিকসের নজর
এবারের ব্রিকস সম্মেলনে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ ও এর অর্থনৈতিক প্রভাব অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হতে পারে। একই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়েও নেতারা আলোচনা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ভারত ইতোমধ্যে রাশিয়ার দিকে আরও বেশি ঝুঁকেছে। তবে ইউক্রেনে রাশিয়ার চলমান যুদ্ধ এবং মস্কোর সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর চাপের মধ্যেই নয়াদিল্লিকে এই ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।

ফলে এবারের সম্মেলনে ভারতের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিভিন্ন পরাশক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

পশ্চিমা প্রভাবের বিকল্প মঞ্চ ব্রিকস
ব্রিকস গঠিত হয় ২০০৯ সালে। পশ্চিমা শক্তির প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোকে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা এবং বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের প্রভাব বাড়ানোই ছিল এই জোটের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

বর্তমানে জোটটির সদস্যসংখ্যা ১১। অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা, বাণিজ্য, জ্বালানি, উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার মতো বিষয়েও ব্রিকসের প্রভাব বাড়ছে।

তবে সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত স্বার্থে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। ভারত ও চীনের সীমান্ত বিরোধ, রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতসহ বিভিন্ন বিষয়ে সদস্যদের অবস্থান এক নয়। ফলে বৈশ্বিক দক্ষিণের একটি শক্তিশালী বিকল্প প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্রিকসের গুরুত্ব বাড়লেও অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য এই জোটের ঐক্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

এই বাস্তবতার মধ্যেই নয়াদিল্লিতে শি জিনপিং, নরেন্দ্র মোদি, ভ্লাদিমির পুতিন ও মাসউদ পেজেশকিয়ানসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের উপস্থিতিতে শুরু হচ্ছে এবারের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। সম্মেলনের আলোচনায় শুধু বৈশ্বিক যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটই নয়, ভারত-চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথও বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে মনে করা হচ্ছে। সূত্র: আল-জাজিরা, রয়টার্স