পৃথিবীতে মহাবিপর্যয় নেমে এলে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ অবস্থানে থাকবে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড

পৃথিবীতে যদি কোনো মহাবিপর্যয়; যেমন-পারমাণবিক যুদ্ধের কারণে ‘নিউক্লিয়ার উইন্টার’, বিশাল কোনো গ্রহাণুর আঘাত, ভয়াবহ মহামারি কিংবা প্রযুক্তিগত বড় বিপর্যয় ঘটলে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

নতুন এক গবেষণার এমন তথ্য উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজ।

গবেষণায় ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, পর্যাপ্ত খাদ্য ও জ্বালানি উৎপাদনের সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রধান সুবিধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, কোনো দেশই এসব বিপর্যয়ের ক্ষতি থেকে পুরোপুরি রেহাই পাবে না। অনেক ক্ষেত্রে সহনশীলতা বা টিকে থাকার ক্ষমতা শুধু জাতীয় সীমানা নয়, বরং স্থানীয় কমিউনিটির প্রস্তুতির ওপরও নির্ভর করতে পারে।

‘গ্লোবাল ক্যাটাস্ট্রফিক রিস্ক’ কী

যে কোনো ঘটনা যদি বিশ্বের অন্তত ১০ শতাংশ মানুষের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে, সেটিকে ‘গ্লোবাল ক্যাটাস্ট্রফিক রিস্ক’ বা বৈশ্বিক বিপর্যয়কর ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এসব ঝুঁকিকে সাধারণত তিনটি বড় ভাগে দেখা হয়। এর মধ্যে রয়েছে- সূর্যালোকের আকস্মিক হ্রাস; অবকাঠামোর ব্যাপক ধ্বংস বা অচল হয়ে যাওয়া ও বৈশ্বিক জৈবিক হুমকি বা মহামারি।

গবেষক ম্যাট বয়েডের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি কেবল কল্পবিজ্ঞানের বিষয় নয়। ইতিহাসে বড় মাত্রার আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং রাজনৈতিক ও সম্রাজ্যের পতনও ঘটেছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারি বৈশ্বিক বিপর্যয়ের সংজ্ঞায় পুরোপুরি না পড়লেও এটি বিশ্বের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতার ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করেছিল।

কেন অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড এগিয়ে?

গবেষণায় অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডকে অনেক ধরনের বৈশ্বিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে—

ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা: দুই দেশই বিশ্বের অন্যান্য প্রধান জনবসতি থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন। ফলে কিছু ধরনের মহামারি, যুদ্ধ বা অন্যান্য বিপর্যয়ের প্রভাব তুলনামূলক দেরিতে পৌঁছাতে পারে।

খাদ্য উৎপাদনের সক্ষমতা: অস্ট্রেলিয়ার বিশাল কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ দেশটিকে খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য স্বনির্ভরতা দিতে পারে।

জ্বালানি ও অবকাঠামো: নিজস্ব জ্বালানি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের মজুত থাকায় দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক সংকটে দেশটি কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারে।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা: গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও তুলনামূলক স্থিতিশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থা সংকট মোকাবিলায় দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়ক হতে পারে।

বড় শহর কেন বেশি ঝুঁকিপূর্ণ?

গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, ঘনবসতিপূর্ণ বড় শহরগুলো অনেক ধরনের বৈশ্বিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বড় শহরে বিপুলসংখ্যক মানুষ খুব অল্প জায়গায় বসবাস করে। তাদের জীবনযাত্রা নির্ভর করে পানি, খাদ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, পরিবহন ও অন্যান্য আন্তঃসংযুক্ত ব্যবস্থার ওপর। কোনো বড় দুর্যোগে এসব ব্যবস্থার একটি অংশ অচল হয়ে গেলে তার প্রভাব দ্রুত অন্য ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, বড় কোনো আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বা পারমাণবিক বিস্ফোরণের ফলে বায়ুমণ্ডলে ছাই ও কণা ছড়িয়ে সূর্যালোক কমে গেলে কৃষি ও খাদ্য সরবরাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

একইভাবে বড় ধরনের সাইবার হামলা শহরের বিদ্যুৎ, পানি, পরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থাকে অচল করে দিতে পারে। আর কোনো নতুন বৈশ্বিক মহামারি দেখা দিলে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বেশি।

আঞ্চলিক অস্ট্রেলিয়ার বিশেষ সুবিধা

শুধু অস্ট্রেলিয়া নামের একটি দেশকে এককভাবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। গবেষকদের মতে, সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় কমিউনিটির সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোভিড-১৯ মহামারির সময় অনেক অস্ট্রেলীয় বড় শহর ছেড়ে অপেক্ষাকৃত ছোট ও আঞ্চলিক এলাকায় চলে গিয়েছিলেন।

নিউ সাউথ ওয়েলসের দক্ষিণ উপকূলের বেগা ভ্যালি তার একটি উদাহরণ। প্রায় ৪০ হাজার মানুষের এই অঞ্চলে একাধিক ছোট শহর ও গ্রাম রয়েছে। খানকার বাসিন্দা কেট সলিসের মতে, বেগা ভ্যালির বড় শক্তি হলো এর সামাজিক সংযোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতা। সংকটের সময় মানুষ একে অপরের ওপর নির্ভর করতে পারে, এমন সামাজিক বন্ধন দুর্যোগের পর দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো দুর্যোগের আগে একটি কমিউনিটির মধ্যে সামাজিক সংহতি যত বেশি থাকে, দুর্যোগের পর সেটি কাটিয়ে ওঠার সম্ভাবনাও তত বেশি হতে পারে। সূত্র: এবিসি