স্যাটেলাইটে ধরা পড়ল সৌদির তেল পাইপলাইনে হামলার ভয়াবহ ক্ষতির চিত্র

ড্রোন হামলার পর সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ একটি তেল পাইপলাইনের পাম্পিং স্টেশনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে স্যাটেলাইটে। সংশ্লিষ্ট খাতের সূত্রগুলো সতর্ক করেছে, দীর্ঘ সময় পাইপলাইনটি বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

রবিবার প্রকাশিত স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, সৌদি আরবের প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘পূর্ব-পশ্চিম’ (East-West) তেল পাইপলাইনের একটি পাম্পিং স্টেশন হামলার পর পুড়ে গেছে এবং মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ এখনো ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ বিবরণ কিংবা পাইপলাইনটি কতদিন বন্ধ থাকতে পারে, সে বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করেনি।

গত ছয় মাসে সৌদি আরবের জন্য এই পাইপলাইনটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরব পারস্য উপসাগর এড়িয়ে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল পাঠাতে এই বিকল্প রুট ব্যবহার করছিল। পাইপলাইনটির মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ইয়ানবু বন্দরে স্থানান্তর করা হচ্ছিল, যা বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশের সমান।

রপ্তানি মজুত নিয়ে উদ্বেগ

সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের রপ্তানি কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত তিনটি সূত্রের দাবি, পাইপলাইনটি বন্ধ থাকায় ইয়ানবু বন্দরে মাত্র পাঁচ থেকে সাত দিন রপ্তানি চালিয়ে যাওয়ার মতো তেলের মজুত রয়েছে।

আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, মিসরের আইন সুখনা ও সিদি কেরির বন্দরেও সৌদি আরবের কিছু তেল মজুত রয়েছে। এসব মজুত দিয়ে কয়েক দিন গ্রাহকদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হলেও সেগুলোও পূর্ণ নয়।

সৌদি তেলের ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, কয়েক দিনের মধ্যে পাইপলাইনটি পুনরায় চালু করা না গেলে রপ্তানির জন্য দেশটির মজুতের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

‘পূর্ব-পশ্চিম’ পাইপলাইনটির দৈনিক প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে। পারস্য উপসাগরীয় রুটের বিকল্প হিসেবে সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল রপ্তানিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মেরামতের সময় নিয়ে অনিশ্চয়তা

পাইপলাইনটি মেরামত করতে কত সময় লাগবে, তা নিয়েও বিভিন্ন সূত্রের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে। রয়টার্সের সূত্রের বরাতে প্রেসটিভি জানিয়েছে, একটি সূত্রের ধারণা, মেরামতে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

অন্যদিকে আরেকটি সূত্র বলেছে, তুলনামূলক দ্রুত মেরামত করা সম্ভব এবং কাজ চলাকালীনই পাইপলাইনের কিছু অংশ দিয়ে আংশিকভাবে তেল পাম্পিং শুরু করা যেতে পারে। তবে সৌদি আরবের সরকারি মিডিয়া অফিস ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় এখনো মেরামতের সম্ভাব্য সময়সীমা বা ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত হিসাব প্রকাশ করেনি।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী

সৌদি তেল সরবরাহে এই বিঘ্ন বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। রোববার ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ৩ দশমিক ৪ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারে পৌঁছায়, যা মে মাসের পর সর্বোচ্চ।

এর আগে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দামও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে গ্যালনপ্রতি গড় মূল্য ৬ ডলারের বেশি হয়।

এদিকে সৌদি আরবের তেল উৎপাদন এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ওপেকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে দেশটির দৈনিক তেল উৎপাদন ৮ দশমিক ১ মিলিয়ন ব্যারেল থাকলেও আগস্টে তা কমে ৬ দশমিক ২৪ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে আসে। ১৯৯০ সালের পর এটি দেশটির সর্বনিম্ন উৎপাদনস্তর বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সৌদি আরবের লোহিত সাগরীয় তেল রপ্তানি পথ ও জ্বালানি অবকাঠামোও ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর হামলার হুমকির মুখে রয়েছে। ইয়েমেনে সৌদি হামলা ও অবরোধ বন্ধের দাবিতে রিয়াদের ওপর চাপ বাড়াতে এসব হামলা চালানো হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো জানিয়েছে।