গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে চুরি হয়েছিল দুটো ছোট্ট ডোরাকাটা লেজের লেমুর। নিছক প্রাণী চুরির খবর হয়েই থাকার কথা ছিল ঘটনাটি। কিন্তু বছর দেড়েক পর সেই খবরই ফের ঝড় তুলল বাংলাদেশের গণমাধ্যমে। একইসঙ্গে শুরু হলো দেশব্যাপী আলোচনা-সমালোচনা। জানা গেছে, চোরাই পথে একাধিক হাত ঘুরে লেমুর দুটো নাকি পৌঁছে গেছে ভারতের গুজরাটের এক বেসরকারি বন্যপ্রাণী কেন্দ্রে। আর সেই কেন্দ্রের মালিক ভারতের শীর্ষ ধনী আম্বানি পরিবার। ফেসবুকের একটি পেজে আপলোড হওয়া ভিডিওতে লেমুর দুটিকে শনাক্ত করে বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডি। তবে সাফারি পার্ক থেকে চুরি হওয়া সেই লেমুরই কি ভারতের গুজরাটে পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ। পার্কে থাকা একটি লেমুরের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকার ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। এরপর ভারতের ‘বনতারা’য় থাকা লেমুরের নমুনার সঙ্গে এটি মিলিয়ে প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করা হবে।
এই ঘটনার সূত্র ধরেই আলোচনায় উঠে এসেছে একটি নাম বনতারা বা ভানতারা, ইংরেজি বানানে Vantara। এরপর থেকেই প্রশ্ন উঠছে নানা দিক থেকে। আসলে কী এই বনতারা? কেনই বা জায়গাটি ঘিরে এত আলোচনা ও সমালোচনা? আম্বানিরা কি সত্যিই প্রাণিপ্রেম থেকে এমন বিশাল আয়োজন গড়ে তুলেছেন, নাকি এর পেছনে রয়েছে বিলাসবহুল প্রদর্শনীর আকাঙ্ক্ষা?
ভানতারা অর্থ ‘বনের তারা’
সংস্কৃত ভাষায় ‘ভানতারা’ বা বনতারা শব্দের অর্থ ‘বনের তারা’। নামের মতোই বিশাল এর পরিসর। গুজরাটের জামনগরে প্রায় ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ একর জমিজুড়ে গড়ে ওঠা এই বন্যপ্রাণী কেন্দ্র এখন বিশ্বের অন্যতম আলোচিত বেসরকারি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও পুনর্বাসন উদ্যোগ। মুকেশ আম্বানির ছোট ছেলে অনন্ত আম্বানির উদ্যোগে গড়ে ওঠা বনতারা শুধু প্রাণী উদ্ধারের একটি কেন্দ্র নয়, বরং হাজার হাজার প্রাণীর উদ্ধার, চিকিৎসা, সংরক্ষণ ও পুনর্বাসনের বিশাল আয়োজন।
ফগ্ধশগুজরাটে গড়ে ওঠা এই কেন্দ্রটির আনুষ্ঠানিক নাম গ্রিনস জুওলজিক্যাল রেসকিউ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার বা জিজেডআরআরসি। এটি পরিচালিত হয় রিলায়েন্স ফাউন্ডেশনের অধীনে। মূলত এটির তত্বাবধানে রয়েছেন মুকেশ আম্বানির পুত্র অনন্ত আম্বানি। বিভিন্ন দেশ থেকে প্রাণী এনে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি বিপন্ন প্রজাতি সংরক্ষণেও কাজ করার দাবি করে প্রতিষ্ঠানটি।
ফজজ্ঞজ্জফসগজ
২০২৫ সালের মার্চে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজে কেন্দ্রটির উদ্বোধন করেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সফরের ছবি প্রকাশ করে এটিকে ‘প্রশংসনীয় প্রচেষ্টা’ বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে বনতারার গল্পের শুরু আরও আগে। প্রথম দিকে আহত হাতি উদ্ধারের উদ্যোগ হিসেবে কাজ শুরু হলেও ধীরে ধীরে সেটিই রূপ নেয় বিশাল এক বন্যপ্রাণী পুনর্বাসন কেন্দ্রে।
হদফঘদফদ
প্রতিষ্ঠাতাদের ভাষ্য, স্বামী বিবেকানন্দের ‘জীব সেবা’ দর্শন থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে এই উদ্যোগের শুরু। আর সেই উদ্যোগই এখন হাজার হাজার প্রাণী, বিপুল জমি, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সংরক্ষণ কার্যক্রম। এবং মাঝে মাঝে একে ঘিরে উচ্চারিত হয় নানা তর্ক-বিতর্ক।
যা আছে এখানে
সংখ্যাগুলো রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। বনতারায় এখন ৩৫ হাজারের বেশি প্রাণী এবং ২০০টিরও বেশি প্রজাতির বসবাস। হাতি, সিংহ, বাঘ, চিতাবাঘ, চিতা, কুমির, সাপ, নানা প্রজাতির পাখি থেকে শুরু করে বিলুপ্তপ্রায় স্পিক্স ম্যাকাওও রয়েছে এই বিশাল কেন্দ্রে।
দ্ঘগফঝফজ
শুধু প্রাণী রাখার জায়গা নয়, চিকিৎসার ব্যবস্থাও এখানে বেশ বড় পরিসরে গড়ে তোলা হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাতি হাসপাতাল বলে দাবি করা একটি স্থাপনাও রয়েছে বনতারায়। সেখানে এমআরআই, সিটি স্ক্যান, হাইপারবারিক অক্সিজেন চেম্বার, হাইড্রোথেরাপি পুল ও বড় জ্যাকুজির মতো সুবিধা রয়েছে। পাশাপাশি আছে সরীসৃপ উদ্ধার কেন্দ্র, বিয়ার এক্সটেনশন ফ্যাসিলিটি, আয়ুর্বেদ ওষুধ প্রস্তুতকরণ কেন্দ্র এবং একটি গবেষণাগার।
প্রাণীদের দেখভালে কাজ করেন প্রায় ২ হাজার ১০০ জন কর্মী। চিকিৎসক, পশুবিদ, খাদ্যতত্ত্ববিদ থেকে শুরু করে প্যারাভেটেরিনারিয়ান, নানা ধরনের বিশেষজ্ঞ রয়েছেন এই দলে।
ফগজফদজফদজ
কলম্বিয়ায় মাদক সম্রাট পাবলো এসকোবারের পরিত্যক্ত এস্টেটে বেড়ে ওঠা ৮০টি জলহস্তীকে হত্যা না করে আশ্রয় দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েও বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে বনতারা। সম্প্রতি বিশ্বের প্রথম বন্যপ্রাণী ও পশুচিকিৎসা বিষয়ক একটি বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণাও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
তারকার মেলা
২০২৪ সালের মার্চে অনন্ত আম্বানি ও রাধিকা মার্চেন্টের বিয়ের আগের অনুষ্ঠানের সময় থেকেই বনতারা বৈশ্বিক গণমাধ্যমের নজরে আসে। এরপর একে একে এই চত্বরে ঘুরে গেছেন মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস, মেটার প্রধান মার্ক জাকারবার্গ, গুগলের সুন্দর পিচাই, ডিজনির বব আইগার, ব্ল্যাকরকের ল্যারি ফিঙ্ক, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ক্লাউস শোয়াব, পপ তারকা রিহানা, ভুটানের রাজা ও কাতারের প্রধানমন্ত্রীসহ বিশ্বের নানা প্রান্তের পরিচিত ব্যক্তিরা।
পরে এই তালিকায় যোগ দেন ফুটবল কিংবদন্তি লিওনেল মেসি, লুইস সুয়ারেজ, রদ্রিগো দে পল এবং ভারতের ক্রিকেট তারকা শচীন টেন্ডুলকার, মহেন্দ্র সিং ধোনির মতো তারকারাও। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বড় ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রও বনতারাকে ‘অবিশ্বাস্য’ ও ‘বিশ্বের বিস্ময়’ বলে অভিহিত করেছেন।
তারকাখচিত এই সফরের তালিকাই বনতারাকে সাধারণ কোনো বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রের পরিচয়ের বাইরে নিয়ে গেছে। আর এর সঙ্গে বেড়েছে বনতারাকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ, আলোচনা ও প্রশ্নও।
হাজার হাজার প্রাণী এল কোথা থেকে?
কিন্তু এই বিশাল সংগ্রহই বনতারার জন্য সবচেয়ে বড় বিতর্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বনতারা প্রায় সাড়ে তিন হাজারের বেশি প্রাণী সংগ্রহ করে। এর বড় একটি অংশ এসেছে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে। সেখানে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বড় বিড়ালজাতীয় প্রাণী (বাঘ ও এ জাতীয়) প্রজনন এবং তথাকথিত ‘ক্যানড হান্টিং’ বা আটকে রেখে শিকারের মতো বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার একটি বিতর্কিত প্রজননকেন্দ্র থেকে ৫০০টির বেশি প্রাণী আমদানির চেষ্টার অভিযোগও উঠেছিল বনতারার বিরুদ্ধে। তবে সরকারি নথিতে প্রকৃতপক্ষে কতগুলো প্রাণী আমদানি করা হয়েছে, সে বিষয়ে পুরোপুরি স্বচ্ছ তথ্য নেই।
জফদজফদজফদজফদ
সমালোচকদের প্রশ্নের মুখে পড়েছে সাইটিসের(বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের বিপন্ন প্রজাতির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণবিষয়ক কনভেনশন) একটি আইনি ব্যবস্থাও। ‘জেড’ নামের একটি পারপাস কোডের আওতায় চিড়িয়াখানাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো অতি বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে আমদানি করতে পারে। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রাণী পরে সরাসরি বাণিজ্যিক প্রজননের কাজেও ব্যবহার করা সম্ভব। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে চিতা স্থানান্তরের ‘প্রজেক্ট চিতা’ প্রকল্পের ব্যর্থতার পর বনতারার ৫৬টি নতুন চিতা আমদানিও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
সুপ্রিম কোর্টের তদন্ত ও ‘ক্লিন চিট’
২০২৫ সালের আগস্টে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলার শুনানিতে বনতারাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হয়। আদালত জানায়, অভিযোগগুলোর পক্ষে সরাসরি প্রমাণ না থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকায় স্বাধীন তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে। এরপর অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিয়ে গঠিত এসআইটি বা স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম প্রাণী অবৈধভাবে সংগ্রহ, বন্যপ্রাণী আইন লঙ্ঘন, আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ পাচারের অভিযোগ খতিয়ে দেখে।
বিচারপতি চেলামেশ্বরের নেতৃত্বে তদন্ত শেষ হওয়ার পর সুপ্রিম কোর্ট জানায়, ৪০ হাজারের বেশি প্রাণী সংগ্রহ ও পরিচর্যার ক্ষেত্রে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন এবং সাইটিসের মানদণ্ড মেনে চলা হয়েছে। আদালত এ সময় মন্তব্য করে, দেশে ভালো কিছু ঘটতে দেওয়া উচিত। একই সময়ে গুজরাট, কর্ণাটক, ত্রিপুরা এবং গৌহাটি হাইকোর্টসহ একাধিক আদালতে বনতারার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া জনস্বার্থ মামলাও খারিজ হয়ে যায়।
‘রিসেট’ চাপে পড়ে পথ পরিবর্তন
আইনি ছাড়পত্র পেলেও সমালোচনা থামেনি। এর মধ্যেই বনতারা নিজেদের কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দেয়। ২০২৬ সালের আগস্টে সাইটিসের সাবেক মহাসচিব জন স্ক্যানলনকে নিয়ে একটি স্বতন্ত্র ‘গভর্নিং কাউন্সিল’ গঠন করা হয়। ভবিষ্যতে প্রাণী আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার থাকবে এই কাউন্সিলের হাতে।
বনতারা জানায়, ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত স্বেচ্ছায় প্রাণী আমদানি স্থগিত রাখবে তারা। বিদেশ থেকে প্রাণী নিয়ে আসার বদলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতেই সংরক্ষণ কার্যক্রমে সহায়তা দেওয়ার দিকে মনোযোগ দেওয়ার কথা জানানো হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ইন্দোনেশিয়ার বন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চুক্তি করে হাতির স্বাস্থ্যসেবা জোরদারে সহায়তা, ব্রাজিলে বিলুপ্তপ্রায় স্পিক্স ম্যাকাও পুনঃপ্রবর্তন এবং লাওসে হাতি সংরক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে।
মাধুরী হাতি নিয়ে বিতর্ক
আরেকটি বিতর্ক তৈরি হয় মহারাষ্ট্রের কোলহাপুরে জৈন মঠে তিন দশক ধরে থাকা হাতি ‘মহাদেবী’ বা ‘মাধুরী’কে ঘিরে। আদালতের নির্দেশে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তাকে বনতারায় নিয়ে যাওয়া হলে কোলহাপুরে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। স্থানীয়দের কাছে হাতিটিকে ঘিরে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুভূতিও জড়িয়ে ছিল।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে হাই পাওয়ার্ড কমিটি কঠোর কিছু শর্তে মাধুরীকে কোলহাপুরে ফিরিয়ে নেওয়ার অনুমতি দেয়। শর্তগুলোর মধ্যে ছিল শোভাযাত্রায় তাকে ব্যবহার না করা এবং নিয়মিত চিকিৎসা পরীক্ষা করানো। বনতারা এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়। তারা জানায়, তাদের পশুচিকিৎসকেরা প্রতি ১৫ দিন পরপর মাধুরীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবেন। সে যেখানেই থাকুক, তার সুস্থতাই তাদের প্রথম অগ্রাধিকার।
dfjfdjdfjপ্রেম, নাকি প্রদর্শনী
তাহলে শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা থেকেই যায়, আম্বানি পরিবার কি সত্যিকারের প্রাণিপ্রেম থেকেই এই বিশাল আয়োজন গড়ে তুলেছে, নাকি এটি এক ধরনের ভাবমূর্তি নির্মাণের চেষ্টা। এর উত্তর অবশ্য সোজাভাবে দেওয়া সম্ভব নয়।একদিকে রয়েছে হাজার হাজার উদ্ধার করা প্রাণী, উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা, বন্যায় বিপর্যস্ত হাতি জয়মতিকে বিমানে করে উড়িয়ে এনে চিকিৎসা দেওয়ার মতো ঘটনা। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সংরক্ষণ প্রকল্পে সহায়তার ঘটনাও রয়েছে। অন্যদিকে রয়েছে এটি কিছু বিতর্ক। তবে যে যাই বলুক না কেনো প্রানীকূলের জন্য বনতারা একটি ‘আশীর্বাদ’।
তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত





