বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে আবারও তীব্র সংকট ঘনিয়ে আসছে। বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম শীঘ্রই ১০০ ডলারের নিচে নামার কোনো সম্ভাবনা নেই। সৌদি আরব তাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তেল পাইপলাইন পুনরুদ্ধারে চরম বেগ পাওয়ার প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ীরা এখন ওই অঞ্চলে বড় ধরনের সরবরাহ ঘাটতির আশঙ্কা করছেন।
সম্প্রতি সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পারস্য উপসাগরের পূর্বাঞ্চলীয় উপকূল আবকাইক থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত এই কৌশলগত পাইপলাইনটি দৈনিক ৪০ লাখ ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল রফতানির সুরক্ষা দিত। পাইপলাইনটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই বিশাল পরিমাণ তেলের রফতানি মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে বড় ধরনের উত্থান দেখা দিয়েছে।
এই নতুন সংকট আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রাহকদের জন্য আরও একটি খারাপ খবর নিয়ে এসেছে। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সামরিক সংঘাত, লোহিত সাগর উপকূলে ইরান সমর্থিত হুতি বাহিনীর দ্রুত স্থল অভিযান এবং বিশ্বের শীর্ষ অপরিশোধিত তেল রফতানিকারক দেশ সৌদি আরবে নতুন করে ধারাবাহিক হামলার পটভূমিতেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, রিয়াদ তাদের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের ক্ষতিগ্রস্ত পাম্পিং স্টেশন দ্রুত মেরামতের জন্য সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। এই বন্ধের মেয়াদ যত দীর্ঘ হবে, বাজারে মূল্যের ধাক্কা তত বেশি মারাত্মক আকার ধারণ করবে। ক্রুড অয়েল বাজারে রিস্টাড এনার্জির ভাইস প্রেসিডেন্ট জানিভ শাহ এ বিষয়ে একটি বিশ্লেষণাত্মক নোটে উল্লেখ করেন, চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে তেলের ওপর আগে থেকেই বাড়তি প্রিমিয়াম যোগ হচ্ছিল, আর সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ হওয়া বাজারে আরও বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। তিনি আরও জানান, বাজার পরিস্থিতি আপাতত ধারণা করছে যে সৌদি আরবের মজুদ তেল দিয়ে নিকট ভবিষ্যতে এই রফতানি ঘাটতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে, তবে এই অচলাবস্থা যদি পাঁচ থেকে সাত দিনের মজুদের সীমা অতিক্রম করে, তবে পরিস্থিতির চিত্র খুব দ্রুত বদলে যেতে পারে।
মঙ্গলবার সকালে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের নভেম্বর মেয়াদের ফিউচার মূল্য ২ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০৭.৮২ ডলারে পৌঁছেছে। গত এক মাসে এই বেঞ্চমার্কে তেলের দাম ২১ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ঊর্ধ্বমুখী ধারা বজায় রেখেছে। অন্যদিকে, মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) বা ইউএস ক্রুডের অক্টোবর মেয়াদের ফিউচার মূল্য প্রায় ২.২ শতাংশ বেড়ে ১০৩.৫৮ ডলারে লেনদেন হচ্ছে। গত এক মাসে প্রায় ২৫ শতাংশের বেশি দাম বাড়ার পর গত সপ্তাহেই ইউএস ক্রুড মে মাসের পর প্রথমবারের মতো ১০০ ডলারের ঘর অতিক্রম করে।
একাধিক ড্রোন হামলার পর সৌদি আরব আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে গত শুক্রবার এই ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। সৌদি সরকার জানিয়েছে, রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে পাইপলাইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ লক্ষ্য করে চালানো ওই হামলায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। আমেরিকা ও ইরানের সংঘাত অব্যাহত থাকায় কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে অপরিশোধিত তেল পাঠাতে সৌদি আরব মূল নিরাপত্তা ঢাল হিসেবে এই ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের ওপর ভরসা করে আসছিল। প্রায় ৭৫০ মাইল দীর্ঘ এই কাঠামোর সাম্প্রতিক সম্প্রসারণের পর দৈনন্দিন পরিবহন সক্ষমতা প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করা হয়েছিল।
অতীতে এই ধরনের ভূ-রাজনৈতিক সংকটের সময় আন্তর্জাতিক তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত তেলের মজুদ ও সঞ্চয় বড় ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু সম্প্রতি বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের টানা যুদ্ধের কারণে এই রক্ষাকবচগুলো দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজার ‘নাইনটি ওয়ান’-এর প্রাকৃতিক সম্পদ বিভাগের প্রধান পল গুডেন ইমেইলের মাধ্যমে জানান, বৈশ্বিক মজুদ থেকে ইতিমধ্যে প্রায় ১ বিলিয়ন ব্যারেল তেল তুলে নেওয়া হয়েছে। ট্যাঙ্ক পুরোপুরি খালি হওয়ার আগে আমাদের কাছে হয়তো আরও প্রায় ১ বিলিয়ন ব্যারেলের মতো সুযোগ রয়েছে, তাই কিছুটা সময় পাওয়া যাচ্ছে। তবে হরমুজ প্রণালি যতদিন বন্ধ থাকবে, তেলের বাজার তত বেশি সংকুচিত হবে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়তেই থাকবে।
কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটের ছবিতে পাইপলাইনের ভয়াবহ ক্ষতির দৃশ্য সামনে আসার পর বিশ্লেষকদের একাংশ ধারণা করছেন যে, এটি মেরামত করতে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে। লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ডি লিপো ইঙ্গিত দিয়েছেন, সম্পূর্ণ পুনরুদ্ধারে কয়েক মাস সময় লেগে যাওয়া অসম্ভব নয়। যদিও ঠিক কতটি পাম্পিং স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা কখন এটি পুনরায় চালু হতে পারে, সে বিষয়ে রিয়াদ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সময়সীমা প্রকাশ করেনি।
ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভেরিস্ক ম্যাপলক্রাফটের প্রিন্সিপাল মিডল ইস্ট অ্যানালিস্ট টর্বজোর্ন সোল্টভেডট মনে করেন, পাইপলাইনের ক্ষতি এবং মেরামতের বিলম্ব আঞ্চলিক সংঘাতের এক মারাত্মক চক্র তৈরি করছে। তিনি বলেন, জ্বালানি অবকাঠামো এবং তেলবাহী ট্যাঙ্কারে ধারাবাহিক হামলার কারণে একদিকে তেল রফতানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে বিকল্প পথে তেল পাঠানোর একমাত্র মাধ্যমটি পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানিতেও বিলম্ব ঘটছে। সোল্টভেডটের মতে, এই হামলার কারণে দৈনিক ৪০ লাখ ব্যারেলের বেশি পরিবহনকারী পথটি বন্ধ হয়ে গেল, ফলে ওই তেল এখন বাধ্য হয়ে হরমুজ প্রণালী দিয়েই পাঠাতে হবে। অথচ সংঘাতের কারণে ওই জলপথ দিয়ে দৈনন্দিন পরিবহন এমনিতেই অত্যন্ত অনিশ্চিত এবং স্বাভাবিক সময়ের মাত্র অর্ধেক তেল এখন সেখান দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
অক্সফোর্ড অ্যানালিটিকার ডেপুটি ডিরেক্টর এবং জ্যেষ্ঠ মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক লরা জেমস একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, ইতিপূর্বে ইষ্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন আক্রান্ত হওয়ার পর এটি পুনরায় চালু করতে মাত্র কয়েক দিন সময় লেগেছিল, তবে এবার ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি গুরুতোর বলে মনে হচ্ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, পাইপলাইনটি যদি মেরামত শেষে চালু করাও হয়, তবুও বাব আল-মানদেবে নতুন করে সংকট দেখা দেবে এবং ওই পথ দিয়ে তেল আদৌ বের হতে পারবে কি না তা নিয়ে বড় অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে। জেমস জানান, ইরান থেকে চাপ সৃষ্টির কারণে পুরো লোহিত সাগর রুট থেকেই তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দিন দিন জোরালো হচ্ছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন নিজেদের মধ্যে গুরুত্ব দিয়ে যোগাযোগ শুরু করেছে এবং এই অভাবনীয় সংকট সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে।
সূত্র: সিএনবিসি





