দেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপন করে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি)। সূর্যের আলো কাজে লাগিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ মেটানোর পাশাপাশি ছাদ ভাড়া থেকে প্রতি মাসে বাড়তি আয় হচ্ছে ১ লাখ ২৭ হাজার টাকা। একই সঙ্গে ছুটির দিনে ক্যাম্পাসে অব্যবহৃত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সোলার সিস্টেম।
শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আর্থিক সাশ্রয়ই নয়, এই সোলার সিস্টেম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহারিক শিক্ষারও একটি জীবন্ত ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। সিস্টেম থেকে পাওয়া রিয়েল টাইম তথ্য গবেষণা ও শিক্ষার কাজে ব্যবহার করছেন শিক্ষার্থীরা। ২০২৩ সালের জুন থেকে যবিপ্রবির অধিকাংশ ভবনের ছাদে রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপনের কাজ শুরু হয়। সুপারস্টার রিনিউঅ্যাবল এনার্জি লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান অপেক্স মডেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনগুলোর প্রায় ৬৩ হাজার বর্গফুট ছাদজুড়ে ১ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সোলার প্যানেল স্থাপন করেছে।
যবিপ্রবির গবেষণাগার উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার মিজানুর রহমান জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের মাসিক বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় ৩ লাখ ইউনিট। এর বিপরীতে বর্তমানে সোলার প্যানেল থেকে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ।
তিনি বলেন, সরকারি নির্ধারিত দরের চেয়ে ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ কম মূল্যে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এই বিদ্যুৎ কিনছে যবিপ্রবি। বাকি বিদ্যুৎ নেওয়া হচ্ছে পল্লী বিদ্যুৎ থেকে। কম দামে বিদ্যুৎ কেনায় প্রতি মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩ লাখ টাকা সাশ্রয় হচ্ছে।
এছাড়া ভবনগুলোর ছাদ প্রতি বর্গফুট ২ টাকা হিসেবে ভাড়া দিয়ে প্রতি মাসে আয় হচ্ছে ১ লাখ ২৭ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ খরচের ক্ষেত্রে প্রতি মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাশ্রয় ও আয় দাঁড়াচ্ছে ৪ লাখ ২৭ হাজার টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ভবনে সোলার প্যানেল স্থাপনের কাজ শেষ হলে এই সাশ্রয়ের পরিমাণ আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
যবিপ্রবি কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রতি সপ্তাহে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটি থাকে। এ দুই দিনসহ অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনে ক্যাম্পাসে ব্যবহার না হওয়া বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি মাসে ২৪ থেকে ২৬ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সোলার সিস্টেম। এই পরিমাণ ভবিষ্যতে আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করছে কর্তৃপক্ষ।
আর্থিক সাশ্রয় ও বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি এই প্রকল্প থেকে উপকৃত হচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের শিক্ষার্থীরা। অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী ইমরান খান বলেন, এই সোলার সিস্টেম শিক্ষার্থীদের জন্য হাতে-কলমে শেখার একটি বাস্তব ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এখান থেকে রিয়েল টাইম ডেটাও পাওয়া যাচ্ছে, যা গবেষণা ও শিক্ষার কাজে সহায়ক হচ্ছে। তিনি বলেন, জ্বালানি সংকটের এই সময়ে লোডশেডিং হলেও সোলার এনার্জি থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম বা গবেষণার কাজ কোনো কিছুই থেমে থাকছে না।
যবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের এখনো কিছু ভবনে সোলার প্যানেল স্থাপনের কাজ বাকি রয়েছে। এসব ভবনে কাজ শেষ হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৪০ শতাংশ সোলার প্যানেল থেকে পাওয়া যাবে।
তিনি জানান, যবিপ্রবির ঝিনাইদহ ক্যাম্পাসেও সোলার প্যানেল স্থাপন করা হবে। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় করা হবে। ফলে ওই ক্যাম্পাসে উৎপাদিত বিদ্যুৎ পুরোপুরি বিনামূল্যে পাওয়া যাবে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্রিট লাইটগুলোতেও সোলার প্যানেল বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
উপাচার্য বলেন, বর্তমানে যে জ্বালানি সংকট চলছে, তাতে সোলার প্যানেল স্থাপনে সরকার সবাইকে উদ্বুদ্ধ করছে এবং সহযোগিতাও করতে চাচ্ছে। সরকার প্রণোদনা দিলে যবিপ্রবির চাহিদার ১০০ শতাংশ বিদ্যুৎ সোলার থেকে উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
ভবিষ্যতে পুরো ক্যাম্পাসকে সৌরশক্তিনির্ভর করে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর।





