পশ্চিমা বিশ্ব কি ব্রিকসের আসল গুরুত্ব বুঝতে পারছে না?

পশ্চিমা বিশ্ব দীর্ঘদিন ধরে ব্রিকসকে ভুলভাবে দেখে আসছে এবং এই জোটের প্রকৃত গুরুত্ব বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। শুরুর দিকে যখন ‘ব্রিক’ আত্মপ্রকাশ করে, তখন বৈশ্বিক সংস্কৃতির যুগে এটিকে নিছক একটি নামের খেলা বা রসিকতা হিসেবেই দেখা হতো। পরবর্তীকালে এটি স্থায়ী রূপ নিলে পশ্চিমা শাসক ও বিশ্লেষকরা একে দরিদ্র দেশগুলোর একটি ক্লাব কিংবা জি-সেভেনের একটি দুর্বল অনুকরণ হিসেবে গণ্য করতে শুরু করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এটি মার্কিন ডলারের আধিপত্যের জন্য এক বড় হুমকি হয়ে উঠেছে এবং নতুন করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নেতাদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২৬ সালে নতুন দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আগে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো জোটের সদস্য দেশগুলোর মধ্যকার অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য তুলে ধরে এটিকে কেবল খণ্ড খণ্ড কিছু উপাদানের সমষ্টি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছে।

তবে এই সমস্ত ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ ব্রিকসের মূল তাৎপর্য উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ব্রিকস হলো একটি উদীয়মান বহুমুখী বা বহু-মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার প্রাথমিক মডেল। বিগত প্রায় পাঁচশ বছর ধরে, যা মূলত পশ্চিমা বৈশ্বিক আধিপত্যের যুগ, বিশ্বব্যবস্থা সর্বদা একক কোনো শক্তির আধিপত্যের ওপর ভিত্তি করেই পরিচালিত হয়েছে। তা হতে পারে স্পেন, ফ্রান্স, ব্রিটেন কিংবা আমেরিকা, অথবা কয়েকটি শক্তির সংমিশ্রণ; যেমন- কনসার্ট অব ইউরোপ কিংবা মার্কিন-সোভিয়েত দ্বি-মেরু ব্যবস্থা। আজকের দিনেও পশ্চিমা বিশ্বে একক শক্তির এই আধিপত্য বিস্তার খুব স্পষ্টভাবে বজায় রয়েছে। যা ন্যাটো, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিংবা এশিয়ার ওয়াশিংটন-নেতৃত্বাধীন জোটগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায়। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নও ন্যাটোর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এর সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈষম্যমূলক ও অসম সম্পর্ক বজায় রেখে চলে।

পশ্চিমা বিশ্বকে যা ঐক্যবদ্ধ রাখে তা কেবল ভূরাজনীতি বা ভূঅর্থনীতি নয় বরং একটি যৌথ দৃষ্টিভঙ্গি। তারা সার্বিকভাবে পশ্চিমা সভ্যতার প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু ব্রিকস সম্পূর্ণ আলাদা এক সত্তা। এর সদস্য দেশগুলোর জনসংখ্যা, ভূখণ্ড, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সামরিক শক্তি এবং প্রযুক্তিগত যোগ্যতায় বিশাল পার্থক্য রয়েছে। ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর মতো তাদের ইতিহাস এত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত নয়। তাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং তাদের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতি প্রায়শই ভিন্ন ভিন্ন অভিমুখে পরিচালিত হয়। ব্রিকস মূলত চীনা, হিন্দু, ইসলামিক, পারস্য, আরব, ল্যাটিন আমেরিকান, আফ্রিকান ও রুশ সভ্যতার প্রতিনিধিত্ব করে। এই অর্থে তারা একমত না হলেও এটিই মানবজাতির বৈচিত্র্যের প্রকৃত প্রতিফলন।

এই জোটের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এতে কোনো একক নেতা নেই। আয়তন, জনসংখ্যা কিংবা অর্থনৈতিক শক্তিতে চীন বা রাশিয়া বিশ্বের শীর্ষসারির শক্তি হলেও ব্রিকসের ওপর তারা নিজেদের নেতৃত্ব চাপিয়ে দেয় না। ইউক্রেন ইস্যুতে ন্যাটোর প্রক্সি যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েও মস্কো ব্রিকসকে একটি প্রথাগত পশ্চিম-বিরোধী জোটে রূপান্তর করার চেষ্টা করেনি। অন্যদিকে ভারত একদিকে যেমন ব্রিকসের একটি বড় অর্থনৈতিক শক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলেছে, তেমনি রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি চীনের বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত মধ্যপ্রাচ্যে মুখোমুখি অবস্থানে থাকলেও ব্রিকসের মঞ্চে তারা একসাথে কাজ করে যাচ্ছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দিল্লির সম্মেলনে অংশ নেওয়া এবং ইরান কর্তৃক আরব প্রতিবেশীদের সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর বিষয়ে আলোচনা প্রমাণ করে যে, এই দেশগুলো নিজেদের দ্বিপক্ষীয় সংঘাত পেছনে ফেলে ব্রিকসের স্থিতিশীলতাকে প্রাধান্য দিচ্ছে।

রাজনৈতিক দর্শন ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও ব্রিকস দেশগুলো সার্বভৌমত্ব, সমতা এবং অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অনাগ্রহ বা অসংলগ্নতার নীতিতে বিশ্বাসী। রাশিয়ার শত্রুরা প্রায়শই মস্কোকে বেইজিংয়ের অধীনস্থ হিসেবে চিত্রিত করে অপমান করতে চায়, যেন পশ্চিমা ইউরোপের ওয়াশিংটনের সামনে মাথা নত করাটা কেবলই একটি সৌজন্য। কিন্তু বাস্তবে চীন-রাশিয়া রাজনৈতিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ সমান মর্যাদার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। ব্রিকস কোনো সামরিক জোট বা পশ্চিম-বিরোধী মোর্চা নয়। এটি এমন একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার বার্তা দেয় যেখানে বৈচিত্র্য বজায় থাকে, সার্বভৌমত্বকে পবিত্র বলে গণ্য করা হয়, বিরোধগুলো আলোচনার মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা করা হয় এবং একতরফা নির্দেশের বদলে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াটি কিছুটা কঠিন হলেও এটি এমন এক বিশ্বব্যবস্থার সুযোগ দেয় যা একক কোনো পরাশক্তির আধিপত্য বা শাস্তিমূলক নীতির চেয়ে অনেক বেশি ন্যায়সঙ্গত।

সূত্র: আরটি