নায়িকা থেকে ফুল বিক্রেতা, বনশ্রীর জীবনের শেষ অধ্যায়

কোনো একসময় রুপালি পর্দার আলোয় দাঁড়িয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন বনশ্রী। ক্যামেরার সামনে মুখে ছিল হাসি, চোখে ছিল ভবিষ্যতের কত রঙ। দর্শকের করতালি, সিনেমার পোস্টারে নিজের মুখ, সব মিলিয়ে জীবনটা যেন ছিল এক টুকরো রূপকথা। কিন্তু রূপকথার গল্প সবসময় সুখের সমাপ্তি পায় না। বনশ্রীর গল্পও শেষ পর্যন্ত এসে থেমেছে এক নিঃশব্দ, বিষণ্ন অধ্যায়ে।

১৯৯৪ সালে ‘সোহরাব-রুস্তম’ সিনেমায় ইলিয়াস কাঞ্চনের বিপরীতে অভিষেক হয়। প্রথম সিনেমাই ছিল ব্যবসাসফল। এরপর মান্না, আমিন খান, রুবেলের মতো জনপ্রিয় নায়কদের সঙ্গে পর্দা ভাগ করে নিয়েছেন তিনি। ‘নেশা’, ‘মহাভূমিকম্প’, ‘প্রেম বিসর্জন’, ‘ভাগ্যের পরিহাস’— একটির পর একটি সিনেমায় অভিনয় করে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। নব্বই দশকের সিনেমাপ্রেমীদের কাছে তখন তিনি ছিলেন পরিচিত এক মুখ, সম্ভাবনাময় এক নায়িকা।

কিন্তু সিনেমার পর্দার গল্পের মতো তার জীবনটা সাজানো ছিল না। খুব অল্প সময়েই রুপালি জগতের আলো থেকে হারিয়ে গেলেন বনশ্রী। আর আলো থেকে সরে যাওয়ার পরই যেন শুরু হলো অন্ধকারের সঙ্গে তার দীর্ঘ সহবাস।

অভিনয়ের সেই হাতেই একসময় জীবিকার জন্য ধরতে হয়েছে ফুলের ঝুড়ি। শাহবাগে ফুল বিক্রি করেছেন। কখনো বাসে বাসে হকারি করেছেন। দিনের শেষে তিন বেলা খাবার জুটবে কি না, সেই হিসাব করতে হয়েছে। যে মুখ একসময় বড় পর্দায় দর্শকের চোখ আটকে রাখত, সেই মুখই ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে স্বার্থপর শহরের ভিড়ে। জীবনের নির্মম বাস্তবতায় বস্তিতেও কাটাতে হয়েছে দিন।

বনশ্রীর জীবনে কেবল অর্থকষ্টই ছিল না, ছিল আপনজন হারানোর শোকও। দুই সন্তানের মধ্যে মেয়েকে হারিয়েছেন। ছেলে মেহেদী হাসান রোমিওকে নিয়েই বয়ে গেছেন জীবনের বাকি পথ। ঢাকার ব্যস্ততা, অভাব আর অনিশ্চয়তার ভেতর শেষ পর্যন্ত ফিরে গিয়েছিলেন নিজের শিকড় মাদারীপুরের শিবচরে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ছোট ঘর হয়ে উঠেছিল তার শেষ ঠিকানা।

একসময় যার ঠিকানা ছিল সিনেমার পর্দা, শেষ জীবনে তার ঠিকানা হয়ে গেল একটি ছোট ঘর। একসময় যার চারপাশে ছিল ক্যামেরা আর মানুষের ভিড়, শেষ দিনগুলোতে তার সঙ্গী ছিল শুধুই নিঃসঙ্গতা।

২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর থেমে যায় বনশ্রীর জীবনের গল্প। আজ তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। একটি বছর পেরিয়ে গেছে। অথচ নীরবেই কেটে গেল দিনটি। নেই তেমন কোনো আয়োজন, নেই স্মরণ করার ব্যস্ততা। যেন সময়ের স্রোতে ভেসে গিয়ে তার নামটিও হারিয়ে গেছে।

তবু কিছু জীবন হারিয়ে গেলেও হারায় না তাদের গল্প। বনশ্রীর গল্পও তেমনই। এটি শুধু একজন নায়িকার মৃত্যুর গল্প নয়; এটি সেই কঠিন বাস্তবতার গল্প, যেখানে করতালির শব্দ থেমে গেলে অনেক তারকার জীবন থেকে মুছে যায় আলো, হারিয়ে যায় পরিচিত মুখ, আর পড়ে থাকে কেবল দীর্ঘ এক নিঃসঙ্গ ছায়া।

রুপালি পর্দায় বনশ্রী হয়তো আর ফিরবেন না। কিন্তু তার জীবনের শেষ দৃশ্যটি যেন মনে করিয়ে দেয়, আলোয় থাকা মানুষটিরও একদিন অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার ভয় থাকে।